‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’

অনলাইন ডেস্ক

‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়, আজিকে যে রাজাধিরাজ, কাল সে ভিক্ষা চায়।’ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই গানটি যেন রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্যেই লিখেছিলেন।

চার মাস আগেও যিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ছিলেন, সেই অভিষেক বন্দোপাধ্যায় এখন চোখের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতিও পাচ্ছেন না। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের একক বেঞ্চ বুধবার অভিষেকের বিদেশে যাওয়ার আবেদন নাকচ করে দেন। এর আগে গত ২০ জুলাইও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে অভিষেকের আবেদন একই বেঞ্চ ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

আদেশে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য বলেন, গত নির্বাচনের প্রচারণার সময় কথিত হুমকিমূলক বক্তব্যের সাথে জড়িত একটি পুলিশ মামলার মুখোমুখি হওয়া ৪০ বছর বয়সী অভিষেকের এই মুহূর্তে দেশ ছাড়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

আদালতের দাবি, ভারতেই তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। বিচারপতি ভট্টাচার্য বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং চিকিৎসা সেবা পাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। একই বেঞ্চ গত ২০ জুলাই বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেদন খারিজ করে বলেছিলেন, কলকাতায় বেশ কয়েকটি নামী চক্ষু ক্লিনিক রয়েছে।

২০ জুলাই বিদেশ যাওয়ার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর অভিষেক সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে যুক্তি দেন যে, তিনি তার বিরুদ্ধে থাকা সমস্ত মামলায় তদন্তকারীদের সহযোগিতা করেছেন এবং তাকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সোমবার কলকাতা হাইকোর্টকে এক সপ্তাহের মধ্যে তার আবেদনটি বিবেচনা করার নির্দেশ দেন।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় দফার আগে, গত ২৭ এপ্রিল একটি জনসভায় বিরোধী দলের নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধে হুমকিমূলক মন্তব্যের একটি মামলায় আগামী ৬ অক্টোবর পর্যন্ত অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বহাল রেখেছেন আদালত। একই সঙ্গে তদন্তে সহযোগিতা করার এবং আদালতের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ না করারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

আদালত তৃণমূল সাংসদকে সরকারি এসএসকেএম হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধানের সামনে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। এসএসকেএম হাসপাতালের রিপোর্ট দেখার পরই আদালত এই বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।

এদিকে, রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং তৃণমূলের বিদ্রোহী শিবির অভিযোগ করেছে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিদেশে পালিয়ে যেতে পারেন। পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল অভিযোগ করেছেন যে, অভিষেক বন্দোপাধ্যায় দেশ ছাড়ার বাহানা হিসেবে তার শারীরিক অবস্থাকে ব্যবহার করতে পারেন।

পাল দাবি করেন, ‘তার যদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়, তবে আমরা রাজ্য সরকারি হাসপাতালেই সর্বোত্তম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে পারি। এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের চিকিৎসা হচ্ছে। দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা এর পেছনে থাকতে পারে।’

বিরোধী দলীয় নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী অভিযোগ করেছে যে, এই লোকসভা সাংসদ ভারতীয় আইন এড়াতে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহার করতে পারেন।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, অভিষেক যদি ভারতের সাথে প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই এমন কোনো দেশে ভ্রমণ করেন, তবে তা ভবিষ্যতে তার বিরুদ্ধে যেকোনো আইনি প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলতে পারে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবির এই অভিযোগ খারিজ করে দিয়েছে। তৃণমূলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ বলেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তার চোখের সমস্যার জন্য বিদেশে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে তাদের রাজনীতি বন্ধ করা উচিত। তিনি কেন পালাবেন? তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিটি মামলার মুখোমুখি হয়েছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করেছেন।’

২০১৬ সালের অক্টোবরে মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতা ফেরার পথে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখের নিচে গুরুতর আঘাত লেগেছিল। তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতে প্রাথমিক চিকিৎসার পর তিনি বিদেশে বিশেষায়িত চিকিৎসা করিয়েছিলেন এবং তারপর থেকে ফলো-আপ প্রক্রিয়ার জন্য তিনি নিয়মিত বিদেশে যাতায়াত করছেন।

নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির ভাইপো অভিষেক বন্দোপাধ্যায় তখন ছিলেন রাজ্যের দ্বিতীয় ক্ষমতাশালী ব্যক্তি। ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই মামলা-হামলায় জেরবার তার জীবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights