চীনের রোবট বিপ্লব: প্রদর্শনীতে দুর্দান্ত, বাস্তব কাজে কেন ব্যর্থ?

অনলাইন ডেস্ক

চীনে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট কুংফু, নাচ কিংবা বক্সিংয়ের মতো জটিল শারীরিক কসরত দেখিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে। কিন্তু কারখানায় মানুষের মতো করে নিয়মিত ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করানোর ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে এসব রোবটের।

দক্ষিণ চীনের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে সারি সারি করে রাখা হয়েছে শতাধিক হিউম্যানয়েড রোবট। সেখানে হেডসেট পরা একদল মানব প্রশিক্ষক রোবটগুলোকে বাক্স সাজানো, নুডলস প্যাকেট করা কিংবা কফি তৈরির মতো সাধারণ কাজ শেখাচ্ছেন।

তবে প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রোবটগুলোর কার্যক্রম এখনও বেশ ধীর এবং অদক্ষ। একজন নতুন প্রশিক্ষককে একটি কার্যকর নড়াচড়া করাতে প্রায় ৩০০ বার চেষ্টা করতে হয়। অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের ক্ষেত্রেও সফল একটি মুভমেন্ট তৈরি করতে গড়ে ৫০টি প্রচেষ্টা প্রয়োজন হচ্ছে।

চীনের রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউবিটেক গত বছরের অক্টোবরে গুয়াংশি আঞ্চলিক সরকারের কাছ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের একটি চুক্তি পায়। এর আওতায় প্রতিষ্ঠানটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির জন্য হিউম্যানয়েড রোবট ও সংশ্লিষ্ট হার্ডওয়্যার সরবরাহ করেছে।

কেন্দ্রটির মূল লক্ষ্য হলো তথাকথিত ‘এমবডিড এআই’ বা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রশিক্ষণ-উপাত্ত তৈরি করা, যার মাধ্যমে রোবট বাস্তব জগতের কোনও পরিস্থিতি দেখে তা বুঝতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সেই অনুযায়ী শারীরিকভাবে কাজ করতে পারে।

প্রশিক্ষকেরা হেডসেট ব্যবহার করে রোবটের দৃষ্টিকোণ থেকে চারপাশ দেখেন। হাতে থাকা সেন্সরযুক্ত কন্ট্রোলারের মাধ্যমে নিজেদের শারীরিক নড়াচড়া রোবটের গতিবিধিতে রূপান্তর করেন।

বয়স্ক হচ্ছে চীন, বাড়ছে রোবটের প্রয়োজন
চীনের জন্য হিউম্যানয়েড রোবটের উন্নয়ন শুধু প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতও।

দেশটির জনসংখ্যা কমছে এবং একই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ফলে শিল্প খাতের অন্যতম বড় শক্তি—বিপুল শ্রমিকের সরবরাহ—ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

এ অবস্থায় শ্রমঘন কাজগুলো রোবটের মাধ্যমে করানো গেলে শিল্প উৎপাদনে শ্রমিকসংকট মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ সামরিক ব্যবস্থায় রোবট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়েও চীনের সামরিক গবেষকেরা কাজ করছেন।

ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স গত এপ্রিলে গুয়াংশির লিউঝৌ শহরের ওই প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিদর্শন করে। কেন্দ্রটির লক্ষ্য ভবিষ্যতে কারখানাগুলোর কাছে রোবট প্রশিক্ষণের উপাত্ত বিক্রি করা। তবে প্রতিষ্ঠানের তিন কর্মী স্বীকার করেছেন, সরকারি ভর্তুকিনির্ভর এই প্রকল্পের এখনও লাভজনক ব্যবসায়িক মডেল তৈরি হয়নি। এর কারণ হিসেবে তারা পরিচালন ব্যয় বেশি এবং নতুন এই বাজারে প্রশিক্ষণ-উপাত্তের দাম কম হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

ইউবিটেক, গুয়াংশি ও লিউঝৌ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।

কুংফু থেকে কারখানা—বাস্তবতার বড় ফারাক
লিউঝৌর প্রশিক্ষণকেন্দ্রটি চীনের হিউম্যানয়েড রোবট নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষার একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরছে। সরকারি অর্থায়ন, শিল্প বিনিয়োগ এবং উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে; কিন্তু রোবটগুলোর বাস্তব জগতের কাজ করার সক্ষমতা এখনও অনেক পিছিয়ে।

চীনের রোবট নির্মাতারা হার্ডওয়্যার তৈরিতে বিশ্বমানের সক্ষমতা অর্জন করলেও সাধারণ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় বুদ্ধিমত্তা এখনও পুরোপুরি তৈরি করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন শিল্প খাতের নির্বাহী ও গবেষকেরা।

বিশেষ করে পূর্বনির্ধারিত রুটিনের বাইরে গিয়ে কোনও পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো কিংবা মানুষের মতো অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রোবটগুলো বড় সমস্যায় পড়ে।

মার্চে এক শিল্প সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোবোটিকস প্রতিষ্ঠান ইউয়ানলি লিংজির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী তাং ওয়েনবিন বলেন, রোবটের ‘আইকিউ খুব কম’। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে যে কাজকে রোবটের কর্মদক্ষতা হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা আসলে নাচ বা পূর্বনির্ধারিত কসরতের মতো প্রদর্শনী।

২০ হাজার রোবটের বাজার, চীনের দখলে ৯৫ শতাংশ
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ হাজার হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি করেছে চীনা নির্মাতারা বলে জানিয়েছে ব্যাংক অব আমেরিকা গ্লোবাল রিসার্চ।

চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা গান শিয়াওবিন জুলাইয়ে বলেন, চলতি বছর দেশটিতে এক লাখের বেশি হিউম্যানয়েড রোবট তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, ব্যাংক অব আমেরিকা-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বছরে হিউম্যানয়েড রোবটের সরবরাহ বেড়ে ১২ লাখ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে।

চীনের এই আধিপত্য অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন নতুন চীনা হিউম্যানয়েড রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করে। যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ছিল, এসব রোবটের মাধ্যমে মার্কিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে বিঘ্ন সৃষ্টি এবং সাইবার হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

ইলেকট্রিক গাড়ি ও সৌরশক্তির মডেলেই রোবট শিল্প
হিউম্যানয়েড রোবটের ক্ষেত্রেও চীন এমন একটি শিল্পনীতি অনুসরণ করছে, যা ইলেকট্রিক গাড়ি ও সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

কৌশলটি হলো—সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একটি কৌশলগত শিল্পকে দ্রুত সম্প্রসারণ করা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং বিপুল সংখ্যক কোম্পানির মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি করা। এর ফলে উৎপাদন খরচ কমবে এবং শেষ পর্যন্ত কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইলেকট্রিক গাড়ি ও সৌর প্যানেলের ক্ষেত্রে যখন চীন উৎপাদন বাড়িয়েছিল, তখন ওই শিল্পগুলো তুলনামূলকভাবে পরিণত পর্যায়ে ছিল। হিউম্যানয়েড রোবট এখনও প্রাথমিক পর্যায়ের প্রযুক্তি।

এ খাতে দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, বুদ্ধিমত্তা, সূক্ষ্মভাবে কাজ করার ক্ষমতা এবং উৎপাদন ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই বড় সমস্যা রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, দেশ-বিদেশে এখনও পর্যাপ্ত বাজার চাহিদা তৈরি হয়নি।

ফলে একই সময়ে সরকারি সংস্থাগুলো এই রোবটের প্রধান অর্থদাতা ও প্রধান ক্রেতা—দুই ভূমিকাতেই থাকছে। এতে প্রকৃত বাজারচাহিদার চেয়ে কৃত্রিমভাবে চাহিদা বেশি দেখানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

হিউম্যানয়েড রোবটের অর্থনীতি এখনও লাভজনক নয়
কিছু বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলছেন, মানুষের আদলে তৈরি একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের রোবট আদৌ অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত কি না।

কারণ নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি প্রচলিত রোবোটিক বাহু ইতোমধ্যেই কারখানায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো তুলনামূলকভাবে সস্তা, দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য।

প্রযুক্তি বিশ্লেষক পো ঝাও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাপকভাবে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের অর্থনৈতিক ভিত্তি এখনও তৈরি হয়নি। কিন্তু চীনের পুঁজিবাজারে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে অত্যন্ত উচ্চ মূল্যায়ন দেওয়া হচ্ছে।

তার মতে, বিনিয়োগকারীরা মূলত ভবিষ্যতে এই রোবট কতটা কার্যকর হয়ে উঠবে, সেই সম্ভাবনার ওপর বাজি ধরছেন।

তবে ঘরবাড়ি বা পরিচর্যা কেন্দ্রের মতো কিছু ক্ষেত্রে হিউম্যানয়েড রোবটের বিশেষ সম্ভাবনা রয়েছে। মানুষের মতো আকৃতির কারণে তারা সিঁড়ি, দরজা কিংবা মানুষের ব্যবহারের জন্য তৈরি সরঞ্জাম তুলনামূলক সহজে ব্যবহার করতে পারবে।

নিকট ভবিষ্যতে অবশ্য হিউম্যানয়েড রোবটের বাজার মূলত ঝুঁকিপূর্ণ, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং কাঠামোবদ্ধ কাজেই সীমিত থাকবে বলে মনে করছেন তিনি।

১৫ হাজার কোটি ডলারের শিল্পগুচ্ছের পরিকল্পনা শেনঝেনে
চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের তথ্যানুযায়ী, দেশটিতে বর্তমানে ১৫০টির বেশি হিউম্যানয়েড রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সংখ্যা চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্র্যান্ডের সংখ্যার চেয়েও বেশি।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির জাতীয়, প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার অন্তত ২৩ কোটি ডলার ব্যয় করেছে হিউম্যানয়েড রোবট ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম কেনায়। এক বছর আগে একই সময়ে এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার; ২০২৪ সালের একই সময়ে ছিল মাত্র ৬০ লাখ ডলার।

রয়টার্স প্রায় এক হাজার সরকারি ক্রয়াদেশ পর্যালোচনা করেছে, যার মধ্যে রোবট, প্রশিক্ষণব্যবস্থা, সরঞ্জাম ও প্রদর্শনী প্রকল্প কেনার তথ্য রয়েছে।

জুনে চীনের শিল্প ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ১০টি প্রদেশকে অন্তত ২০টি করে বাস্তব প্রশিক্ষণকেন্দ্র চিহ্নিত করার নির্দেশ দেয়।

এপ্রিল মাসে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ কোম্পানি স্টেট গ্রিড এআই-সক্ষম হিউম্যানয়েড, দুই হাতের রোবট এবং রোবট কুকুর কিনতে ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা ঘোষণা করে।

অন্যদিকে, শেনঝেন আগামী বছরের মধ্যে ১ হাজার ২০০টির বেশি এমবডিড-ইন্টেলিজেন্স রোবোটিকস কোম্পানি নিয়ে ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের একটি শিল্পগুচ্ছ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে।

ভর্তুকি ছাড়া কতটা টেকসই?
সরকারি নীতির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই শিল্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি।

হাংঝৌভিত্তিক ডিপ রোবোটিকস জানিয়েছে, গত বছর তাদের ৪২ শতাংশের মতো নিট মুনাফা এসেছে সরকারি ভর্তুকি থেকে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ ও ২০২৫ সালে মাত্র চারটি হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি করেছে।

অন্যদিকে, গত বছরের শেষ প্রান্তিকে ইউবিটেক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অন্তত ১২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নতুন চুক্তি পেয়েছে। এই অঙ্কই কোম্পানিটির ২০২৫ সালের মোট হিউম্যানয়েড ব্যবসার আয়ের চেয়ে বেশি।

ইউবিটেক গত বছর ১ হাজার ৭৯টি পূর্ণ আকারের হিউম্যানয়েড রোবট সরবরাহ করেছে।

প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোবটের দামও দ্রুত কমছে। মরগ্যান স্ট্যানলি ধারণা করছে, ২০২৬ সালে হিউম্যানয়েড রোবটের গড় দাম ১৫ শতাংশ কমতে পারে।

চীনা প্রতিষ্ঠান লেজু রোবোটিকসের তৈরি পূর্ণ আকারের কুয়াভো রোবটের দাম ২০২৫ সালে আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমে প্রায় ৪৬ হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে।

প্রচারমূলক অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য ভাড়া দেওয়া নাচের রোবটের দৈনিক ভাড়াও প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে কমে ৪৪০ থেকে ৬০০ ডলারে নেমে এসেছে।

কারখানায় এখনও রোবোটিক বাহুই এগিয়ে
চীনের শিল্প খাতে হিউম্যানয়েড রোবটের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে—তারা প্রচলিত শিল্প রোবটকে কতটা প্রতিস্থাপন করতে পারে।

শিল্প কারখানায় রোবটের কার্যকারিতা মাপার প্রধান মানদণ্ড হলো কতক্ষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে এবং কতটা নির্ভরযোগ্যভাবে একই কাজ বারবার করতে পারে।

শেনঝেন রোবোটিকস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব র‍্যাচেল তান বলেন, এই বিচারে প্রচলিত রোবোটিক বাহু এখনও হিউম্যানয়েড রোবটের তুলনায় এগিয়ে।

চীনের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক গাড়ি শিল্পেও উৎপাদন লাইনগুলো ইতোমধ্যে শিল্প রোবটে ব্যাপকভাবে স্বয়ংক্রিয়। এগুলো হিউম্যানয়েড রোবটের তুলনায় দ্রুত এবং নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ।

বেইজিংয়ে শাওমির বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানায় উৎপাদন প্রক্রিয়ার ৯১ শতাংশ স্বয়ংক্রিয় বলে জানিয়েছে কোম্পানিটি। সেখানে গাড়ির বডি তৈরির অংশে ৭০০টির বেশি শিল্প রোবট ওয়েল্ডিং, রিভেটিং ও আঠা লাগানোর কাজ করছে।

শাওমি অবশ্য কিছু কাজের জন্য হিউম্যানয়েড রোবট প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর মধ্যে বাদাম বা নাট বসানোর মতো কাজ রয়েছে। তবে রয়টার্সের পরিদর্শনের সময় কারখানার উৎপাদন এলাকায় মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।

চীনের গাড়ি নির্মাতা গিলির জিকর ব্র্যান্ডও ইউবিটেকের সঙ্গে অংশীদারত্ব করে হিউম্যানয়েড রোবট দিয়ে উপকরণ বাছাই, বাক্স সরানো ও যন্ত্রাংশ ব্যবহারের পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে কোম্পানিটির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সক্রিয় উৎপাদন লাইনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো রোবোটিক বাহু ও স্বয়ংক্রিয় যানই করছে।

ফার্মেসিতে হিউম্যানয়েড রোবটের বাস্তব ব্যবহার
তবে সব ক্ষেত্রেই যে হিউম্যানয়েড রোবট ব্যর্থ হচ্ছে, তা নয়। চীনে এর কিছু বাস্তব বাণিজ্যিক ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
রোবট নির্মাতা গ্যালবট দেশটির দুই ডজনের বেশি শহরের ফার্মেসিতে রোবট ব্যবহার করছে। কর্মীসংকট মোকাবিলা এবং ওষুধ সরবরাহের চাহিদা পূরণই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

বেইজিংয়ের একটি ফার্মেসিতে রয়টার্স দেখেছে, ডিজিটাল অর্ডার পাওয়ার পর গ্যালবটের রোবট তাক থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য তুলে নিচ্ছে।

রোবটটির মাথা, হাত ও ধড় থাকলেও এটি চাকার ওপর ভর করে চলে। ক্যামেরা, হাতের কবজিতে থাকা আরেকটি ক্যামেরা, গ্রিপার ও সাকশন কাপ ব্যবহার করে এটি পণ্য শনাক্ত করে তুলে নেয়।

গ্যালবটের প্রধান কৌশল কর্মকর্তা ঝাও ইউলি জানান, একটি পণ্য বেছে নিয়ে প্রস্তুত করতে রোবটটির প্রায় এক মিনিট সময় লাগে। সাধারণ একটি ফার্মেসিতে ৩০ থেকে ৫০ বর্গমিটার জায়গায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার ধরনের পণ্য থাকতে পারে। ফলে একই ধরনের পণ্য খোঁজা ও তুলে দেওয়ার কাজটি স্বয়ংক্রিয় করার সুযোগ রয়েছে।

কোম্পানিটির দাবি, রোবটের সফলতার হার ৯৫ শতাংশের বেশি। বেশির ভাগ ব্যর্থতা ঘটে পণ্য ঠিকভাবে আঁকড়ে ধরতে না পারার কারণে; ভুল পণ্য বেছে নেওয়ার কারণে নয়।

‘চোখ’ দিয়ে দেখা আর ‘হাত’ দিয়ে কাজ করা এক নয়
হিউম্যানয়েড রোবটের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত সমস্যা তাদের ‘মস্তিষ্ক’ বা এআই মডেল।

চ্যাটবট যেমন ডিপসিক বা কিমি বিপুল পরিমাণ লিখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে কাজ করে, কারখানায় ব্যবহৃত হিউম্যানয়েড রোবটকে তার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের তথ্য নিয়ে কাজ করতে হয়।

একটি কাপড় ধরতে কতটা শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, একটি স্ক্রু ঘোরানোর সময় কতটা চাপ দিতে হবে কিংবা কোনও বস্তু কীভাবে ধরলে তা পড়ে যাবে না—এসব সিদ্ধান্ত নিতে রোবটকে একই সঙ্গে দেখতে, বুঝতে এবং শারীরিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়।

এই প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘ভিশন-ল্যাঙ্গুয়েজ-অ্যাকশন’ মডেল। এগুলো প্রশিক্ষণ দেওয়া বড় ভাষা মডেলের তুলনায় অনেক কঠিন। কারণ রোবটকে বাস্তব জগতের হাজারো ভিন্ন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।

একটি নির্দিষ্ট কারখানায় কোনও কাজ ঠিকভাবে শিখে নেওয়ার পরও অন্য জায়গায় আলো, বস্তু, কোণ, পৃষ্ঠ, সময় বা যন্ত্রপাতি সামান্য বদলে গেলে রোবটটি ব্যর্থ হতে পারে।

বেইজিং ইনস্টিটিউট ফর জেনারেল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের গবেষক জিয়া বাওশিয়ং বলেন, সমস্যাটি এখন ১০ সেন্টিমিটার থেকে কমে ১ সেন্টিমিটার, এমনকি ১ মিলিমিটার পর্যন্ত নেমে এসেছে—অর্থাৎ কাজের শেষ মুহূর্তের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠছে।

রোবট আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ-উপাত্ত নেই
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট প্রকল্পের পেছনে একটি সহজ হিসাব কাজ করছে—যত বেশি রোবট প্রশিক্ষণে থাকবে, তত বেশি তথ্য সংগ্রহ করা যাবে।

প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী রবার্ট উ বলেন, এমবডিড-এআই মডেল উন্নত করতে একটি পর্যায়ের অতিরিক্ত উৎপাদন প্রয়োজন হতে পারে। কারণ এই মডেল তৈরির জন্য প্রথমে বিপুল পরিমাণ তথ্য দরকার; আর সেই তথ্য সংগ্রহের জন্য মাঠে বিপুলসংখ্যক হার্ডওয়্যার স্থাপন করতে হবে।

তবে তথ্যের ঘাটতি এখনও বিশাল। শিল্পখাতের হিসাব অনুযায়ী, হিউম্যানয়েড রোবটের কাছে বর্তমানে প্রায় ৫ লাখ ঘণ্টার উচ্চমানের প্রশিক্ষণ-উপাত্ত রয়েছে। অথচ প্রকৃত শারীরিক বুদ্ধিমত্তা অর্জনের জন্য প্রয়োজন প্রায় ১০ কোটি ঘণ্টার তথ্য।

অর্থাৎ শুধু বিপুল অর্থ বিনিয়োগ বা বিপুলসংখ্যক রোবট উৎপাদন করলেই এই ঘাটতি দ্রুত পূরণ হবে না।

চীনা স্টার্টআপ এক্স স্কয়ার রোবট অবশ্য ভিন্ন পরিবেশে রোবট প্রশিক্ষণের চেষ্টা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ১০০টি বাড়ি থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে মডেল প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, যাতে আলোর পরিবর্তন, অগোছালো পরিবেশ ও অপরিচিত বস্তু মোকাবিলায় রোবটের সক্ষমতা বাড়ানো যায়।

‘বাবল’ ফাটার আশঙ্কা
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়লেও অনেক উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী মনে করছেন, ২০২৬ সালের শেষ দিকে কিংবা ২০২৭ সালে এই খাতে বড় ধরনের একীভূতকরণ শুরু হতে পারে।

তাদের ধারণা, সরকার একসময় ভর্তুকি কমিয়ে সবচেয়ে কার্যকর ও সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই সহায়তা কেন্দ্রীভূত করবে। তখন দুর্বল কোম্পানিগুলোর অনেকেই বাজার থেকে ছিটকে পড়তে পারে।

বিনিয়োগকারী উ বলেন, প্রায় সব কোম্পানিই জানে যে প্রকৃত বাণিজ্যিক সাফল্যের লক্ষ্যে পৌঁছাতে এখনও অনেক পথ বাকি। সে কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে যত বেশি সম্ভব মূলধন সংগ্রহ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।

চীনে রোবটের যন্ত্রাংশের দামও দ্রুত কমছে। ফলে বিদেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের পক্ষে চীনের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পাল্লা দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

ইউনিট্রির উত্থানে নতুন আগ্রহ
এই খাতে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে বর্তমানে ইউবিটেক ও ইউনিট্রিকে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক।

রোবট কুকুরের বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিক্রেতা এবং হিউম্যানয়েড রোবটের দ্বিতীয় বৃহত্তম নির্মাতা ইউনিট্রি চীনের এই শিল্পে বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠেছে।

১৯ আগস্ট সাংহাইয়ে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন শুরু হলে দাম পাঁচ গুণের বেশি বেড়ে যায় এবং কোম্পানিটির বাজারমূল্য প্রায় ৫ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছায়। পরে অবশ্য শেয়ারের দাম কিছুটা কমে আসে।

চীনের অন্যান্য এমবডিড-এআই কোম্পানি যারা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে, তারা এখন ইউনিট্রির অগ্রগতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিনিয়োগকারীরাও বাস্তব ব্যবসা রয়েছে এমন রোবট কোম্পানি এবং কেবল ভবিষ্যতের সম্ভাবনার গল্প বিক্রি করছে এমন কোম্পানির মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করছেন।

সামনে কী?
চীনের হিউম্যানয়েড রোবট শিল্পের সামনে একই সঙ্গে বড় সম্ভাবনা ও বড় ঝুঁকি রয়েছে।

একদিকে রয়েছে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ, শক্তিশালী উৎপাদন অবকাঠামো, দ্রুত কমতে থাকা যন্ত্রাংশের দাম এবং বিশাল সরবরাহব্যবস্থা। অন্যদিকে রয়েছে অপরিণত এআই, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ-উপাত্তের ঘাটতি, ধীরগতি, ভুলের উচ্চ হার এবং এখনও সীমিত বাণিজ্যিক চাহিদা।

লিউঝৌ প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রয়টার্স একটি হিউম্যানয়েড রোবটকে বাক্স বহন করতে গিয়ে হিমশিম খেতে দেখেছে। এক কর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এসব রোবট মানুষের গতির বা উৎপাদনক্ষমতার মাত্র প্রায় ২০ শতাংশে কাজ করতে পারে।

তবে তার ধারণা, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে রোবটগুলো মানুষের দক্ষতার অনেকটাই কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারে।

চীনের এই দৌড় শেষ পর্যন্ত সফল হলে দেশটি শুধু হিউম্যানয়েড রোবটের বৃহত্তম নির্মাতা নয়, বরং এদের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, সফটওয়্যার, প্রশিক্ষণ-উপাত্ত ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

কিন্তু বিপুল উৎপাদন ক্ষমতা যদি প্রকৃত বাজারচাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়, তাহলে শিল্পটিতে বড় ধরনের মূল্যপতন, কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির ঝুঁকিও তৈরি হবে।

অর্থাৎ কুংফু বা বক্সিংয়ের মঞ্চে চীনের হিউম্যানয়েড রোবট ইতোমধ্যে নিজেদের সামর্থ্য দেখিয়েছে। এখন আসল পরীক্ষা—তারা কবে সত্যিকার অর্থে মানুষের মতো করে কারখানায় কাজ করতে পারবে। সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights