চীনের শেয়ারবাজারে ধস, বাজারমূল্য কমেছে ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার
অনলাইন ডেস্ক
চীনের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন দেখা দিয়েছে। গত মে মাসের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে দেশটির শেয়ারবাজারের মোট বাজারমূল্য কমেছে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। গত সপ্তাহে বিক্রির চাপ আরও তীব্র হওয়ায় মূল ভূখণ্ডের বেঞ্চমার্ক সূচক সিএসআই ৩০০ বিয়ার মার্কেটে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে হংকংয়ের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের সূচক হ্যাং সেং টেক ইনডেক্সও দুই বছর আগে বেইজিংয়ের ঘোষিত অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজের পর অর্জিত প্রায় সব মুনাফা হারানোর কাছাকাছি পৌঁছেছে।
দ্য জাপান টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ভোগব্যয় সংকোচন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে ব্যাংক, বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা, আবাসন খাতের প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মডেল নির্মাতাদের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
চীনের শেয়ারবাজারের দরপতনের পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিভিন্ন কোম্পানির মুনাফার পূর্বাভাস কমে যাওয়া। এমএসসিআই চায়না সূচকভুক্ত কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের সম্মিলিত মুনাফার পূর্বাভাস মার্চের শেষ থেকে ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
অন্যদিকে, চীনের ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আধিপত্য থাকা হ্যাং সেং টেক ইনডেক্সের আওতাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মুনাফার পূর্বাভাস কমেছে ১৩ শতাংশেরও বেশি। বিশেষ করে ই-কমার্স খাতে তীব্র মূল্য প্রতিযোগিতা কোম্পানিগুলোর আয় ও মুনাফার সম্ভাবনাকে দুর্বল করে তুলছে।
যেসব কোম্পানি ইতোমধ্যে তাদের আর্থিক ফলাফল প্রকাশ করেছে, এমএসসিআই চায়না সূচকভুক্ত সেসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বিশ্লেষকদের সম্মিলিত পূর্বাভাসের তুলনায় গড়ে ৯ শতাংশ কম হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, দুই বছরের মধ্যে কোনো প্রান্তিকে পূর্বাভাসের তুলনায় এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম নেতিবাচক ব্যবধান হয়ে উঠতে পারে।
ব্যাটারি নির্মাতা সিএটিএল বিশ্লেষকদের মুনাফার পূর্বাভাস পূরণ করতে পারেনি। চায়না মোবাইলের চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিট মুনাফা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ শতাংশ কমেছে। এ ছাড়া লিথিয়াম উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গানফেং লিথিয়াম গ্রুপও বাজারে দাম কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
অর্থায়নের চাপে কোম্পানি, বাড়ছে শেয়ার বিক্রি
মুনাফার ওপর চাপ বাড়ায় কিছু কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে নতুন অর্থ সংগ্রহের পথে হাঁটছে। এর মধ্যে আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিং অতিরিক্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করেছে। নতুন শেয়ার ইস্যু বা বিক্রির ফলে বিদ্যমান শেয়ারধারীদের মালিকানার অনুপাত কমে যেতে পারে, যা তাদের বিনিয়োগের ওপর প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, চীনের মূল ভূখণ্ডের শেয়ারবাজারে লেনদেনের পরিমাণ গত বছরের জুলাইয়ের পর সর্বনিম্ন পর্যায়গুলোর কাছাকাছি রয়েছে। মার্জিন লেনদেনের পরিমাণও এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। মার্জিন লেনদেনে বিনিয়োগকারীরা ধার করা অর্থ ব্যবহার করে শেয়ার কেনেন। এ ধরনের লেনদেন কমে যাওয়া বাজারে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।
শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে চীনা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে রাষ্ট্র-সমর্থিত বিনিয়োগ তহবিল ব্যবহার করেছে। এসব তহবিলের মাধ্যমে শেয়ার কেনার উদ্দেশ্য হলো বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখা।
অর্থনীতিতে চাপ থাকা সত্ত্বেও বড় আকারের নতুন প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে চীন সরকার। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের প্রথম নয় মাসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকায় বেইজিংয়ের সামনে ধাপে ধাপে অর্থনৈতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার সুযোগ রয়েছে। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে বড় আকারের প্রণোদনা দেওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে নীতিগত সহায়তা দেওয়ার পথেই এগোতে পারে কর্তৃপক্ষ।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও ভোগব্যয় দুর্বল হওয়া, কোম্পানিগুলোর মধ্যে মূল্যযুদ্ধ এবং মুনাফার পূর্বাভাস কমে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চীনের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র : ইউএ.নিউজ
