জুলাইয়ের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন যাঁরা

জয়শ্রী ভাদুড়ী
উত্তাল গণ অভ্যুত্থানের ৪ আগস্ট বেলা ১টার দিকে ছাত্র-জনতার একটি মিছিল রাজধানীর উত্তরার রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স এলাকায় পৌঁছলে রাবার বুলেট ছোড়ে পুলিশ। এসময় পুলিশের সঙ্গে মিলে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ এমপির নেতা-কর্মীরা। মিছিলের সামনে সারিতে ছিলেন এনাম সিদ্দিকী (৩৬)। পুলিশের ছোড়া রাবার বুলেট সরাসরি তাঁর মাথায় আঘাত হানলে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এসময় গুলিবিদ্ধ, রক্তাক্ত এনামের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ফ্যাসিস্টের সহযোগী হায়ানারা। তাঁর মাথা ও শরীরকে হকিস্টিক দিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। এক সময় মৃত মনে করে চলে যায়।

এভাবেই বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে ২০২৪ সালের উত্তাল গণ অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণা করে কথাগুলো বলছিলেন এনাম। তিনি বলেন, ‘আমি উত্তরা একটি বায়িং হাউসের চিফ অপারেটিং অফিসার (সিও ও) ছিলাম। কিন্তু আন্দোলনে পাওয়া আঘাতে আমি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। মাথায় আঘাত করায় ব্রেনে রক্ত জমে যায়। এর ফলে শরীরের একপাশ প্যারালাইজড হয়েছে। নিয়মিত জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। সরকার থেকে যে ভাতা পাওয়া যায় তাতে ওষুধের খরচ চলে না। এ জন্য বাসার মালপত্র বিক্রি করে ঢাকার বাসা ছেড়ে দিয়েছি। স্ত্রী, সন্তান আর মাকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছি। শরীরে ক্ষত, সংসারের খরচ মেটাতে কাজ করতে পারি না। আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’

৩৬ জুলাই গণ অভ্যুত্থানের এমন হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছেন এনাম। কিন্তু এই বেঁচে থাকা আজ ওর জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এনামের মতো জুলাই বিপ্লবের দিনগুলোতে রাজপথে গুলিবিদ্ধ হয়ে যারা হাত-পা, চোখ হারিয়ে স্বাভাবিক জীবন চলার সক্ষমতা হারিয়েছিলেন, তাঁদের জুলাই গণ অভ্যুত্থানের লড়াইটা এখনো শেষ হয়নি, বরং আরও তীব্রভাবে চলমান। আজও তাদের কারও দিন কাটছে হাসপাতালের বেডে বা ফলোআপ চিকিৎসায়। কেউ নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন। কেউ কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ে হাঁটার চেষ্টা করছেন, আবার কেউ দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে নতুন জীবন গড়ার সংগ্রাম করছেন। আহতরা শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন জুলাই বিপ্লবের দগদগে ক্ষত। এর মধ্যে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক পরিবার আজ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী তামিম ইকবালের কোমরের দুটি ডিস্ক ভেঙে যায় আন্দোলনের সময়। দুই বছর পরও তাঁকে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন জরুরি। অনেক আহত এখনো চিকিৎসাবঞ্চিত।’

বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার আহত ব্যক্তি নিয়মিত ফলোআপ চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে অন্তত আড়াই হাজার রোগী নিয়মিত ঢাকায় চিকিৎসার জন্য আসেন। এদের মধ্যে ২ হাজার ব্যক্তি স্থায়ীভাবে অঙ্গ হারিয়েছেন বা কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। বিদেশে উন্নত চিকিৎসা নিতে যাওয়া ১৫৪ জনের মধ্যে এখনো ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন। বিদেশে চিকিৎসা শেষে দেশে আসার পর শয্যাশায়ী হয়ে পড়ে আছেন ২৫ জন আহত। এদের মধ্যে সিএমএইচ হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন সাতজন।

থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অন্তত ১০ জন আহত এখনো শয্যাশায়ী। এদের মধ্যে মিলন ও মুরাদের অবস্থা বেশি খারাপ। এখনো বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। শরীরে ঘা হয়ে গেছে। পেশায় এ দুজনই শ্রমিক। মিলন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। ছররা গুলির আঘাতে তাঁর লিভার নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া একটি শিসার বুলেট তাঁর কোমরের একপাশ দিয়ে ঢুকে অপর পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি অচল। চট্টগ্রাম শহরে আন্দোলন চলাকালে মুরাদের গলার নিচের অংশে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। আহত হওয়ার পর থেকে মুরাদ অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। গুলিতে কণ্ঠনালি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁর কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় গুলি লাগার পর থেকেই। নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডে ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে আহত হন রাকিব। পরে পঙ্গু হাসপাতালে তাঁর বাম পা কেটে ফেলতে হয়। এক সময় সেলুনে কাজ করা রাকিব এখন বাবার দোকানে বসেন। ব্র্যাকের দেওয়া কৃত্রিম পা ব্যবহার করলেও আগের মতো কাজ করতে পারেন না।

জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) বা পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. আবুল কেনান বলেন, ‘আহতদের অনেকে এখনো নিয়মিত ফলোআপের জন্য হাসপাতালে আসেন। বিশেষ করে যাদের আগে অস্ত্রোপচার করে হাড়ের জোড়ায় স্ক্রু বা রিং লাগানো হয়েছিল, হাড় জোড়া লাগার পর এখন সেগুলো খোলার কাজ চলছে। চিকিৎসাধীন ২১ জনের অঙ্গহানি হয়েছে, যার মধ্যে ১৮ জন পা এবং তিনজন হাত হারিয়েছেন। তাদের কৃত্রিম অঙ্গ দেওয়া হয়েছে এবং তারা বর্তমানে সেগুলো ব্যবহার করছেন।’ জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ অভ্যুত্থানের সময় ২ হাজারের বেশি আহত ব্যক্তি স্থায়ীভাবে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ হাজার ৪০০ জনকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও জীবিকার ব্যবস্থা করা গেছে মাত্র ১৫০টি পরিবারের। এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন চিকিৎসার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান। জানা যায়, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের দুই দিন পর ১০ তারিখে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। সে সময়ে আহতদের ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ হিসেবে জরুরি সহায়তা দিতেই গঠিত হয় জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা ও অন্যান্য উৎস থেকে প্রাপ্ত অনুদান ১২২ কোটি টাকা জুলাই বিপ্লবে শহীদ ৮৩১ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আর ৬ হাজার ১২৭ জন আহত ব্যক্তিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিভিত্তিক ৭৮ কোটি টাকাসহ মোট ১১৭ দশমিক ৫ কোটি টাকা জরুরি আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুলাই গণ অভ্যুত্থান শাখার উপসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আহতদের চিকিৎসা, মাসিক ভাতা, এককালীন অনুদান ও বিদেশে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে এ পর্যন্ত ৯৭৩ কোটি ৩৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বিদেশে চিকিৎসা ব্যয় হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি। বিদেশে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৫৪ জন। তাদের মধ্যে ১০৬ জন থাইল্যান্ড, ৪০ জন সিঙ্গাপুর, সাতজন তুরস্ক এবং একজন রাশিয়ায় চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ৩৯ জন থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন।’ তিনি আরও জানান, ‘বিদেশে এখনো যারা চিকিৎসাধীন আছেন তারা অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগী। দেখা গেছে, হাসপাতাল থেকে বের করা ঝুঁকিপূর্ণ। আর যাদের শুধু প্যালিয়েটিভ কেয়ার দরকার তাদের আমরা দেশে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আহতদের মধ্যে ৯৯০ জন ‘ক’, ১ হাজার ৪১৭ জন ‘খ’ এবং ১১ হাজার ৯৬৩ জন ‘গ’ ক্যাটাগরির ভাতাভোগী। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৩৭০ জন মাসিক ভাতার আওতায় রয়েছেন।’

জানা যায়, সরকার চিকিৎসা, ভাতা, এককালীন অনুদান ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসাসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তবে আহতদের অনেকেই বলছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যয় প্রাপ্ত সরকারি ভাতার চেয়ে বেশি। সে ব্যয় নির্বাহ করতে অনেককে জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights