উপেক্ষিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কওমি শিক্ষার্থী

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সাফল্য নিশ্চিত হয়েছিল চব্বিশের ৫ আগস্ট। ওইদিন ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে পালিয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ অভ্যুত্থানের নেপথ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের বড় অবদান থাকলেও দেখি সব জায়গায় তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠনকালে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক একটি নির্দিষ্ট ‘কোরাম’ প্রাধান্য পাচ্ছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য হতাশাজনক।

সম্প্রতি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে কথাগুলো বলছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নামক প্ল্যাটফর্মের সৃষ্টি হয়েছিল, তার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সমন্বয়ক ছিলাম। একই সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কের একজন ছিলাম।

আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি নিজের ভূমিকার স্মৃতিচারণা করে বলেন, আন্দোলনের শুরুতে একজন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করলেও আমি আসলে এই আন্দোলনে যেতে ইচ্ছুক ছিলাম না। কিন্তু ১৪, ১৫ এবং ১৬ জুলাইতে যখন ছাত্রীদের ওপর হামলা করা হয়, রাজাকার ধ্বনি তুলে প্রতিবাদ করা হয়, তখন মনে হয়েছিল যে কিছু একটা করা দরকার। তখন আন্দোলনের নেতৃত্বে যুক্ত হই। ১৬ জুলাই তারিখ আমরা আন্দোলনে থাকা অবস্থায় পুলিশের গুলিতে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু সাঈদকে হত্যার খবর পাই। রাজনৈতিক অঙ্গনে একটা কথা আছে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মেরে ফেলা হলে ওই সরকার আর ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। তখন ওই মুহূর্তেই ডিসিশনটা ফাইনাল হয়ে যায়। আমরা বুঝতে পারি আন্দোলনটি সরকার পতনের আন্দোলনে যাবে। প্রায়শ্চিত্ত একমাত্র হাসিনার পদত্যাগ। তিনি আরও বলেন, তখন ফেসবুকে পোস্ট করাও ছিল এক ধরনের অপরাধের মতো। তবুও আমি ১৬ তারিখ থেকে লাগাতার কর্মসূচি ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম। সে সময় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করতে এক বা একাধিক মেসেঞ্জার গ্রুপ খোলা হয়।

সাবেক সমন্বয়ক আয়াতুল্লাহ বেহেস্তি বলেন, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন সংগঠিত হয় ‘আমরা রাজাকার’ নামক গ্রুপের মাধ্যমে, বর্তমানে যার নাম ‘আমরা এনএসইউআর’, যেটির মাধ্যমে ধাপে ধাপে আন্দোলন এগিয়ে নেওয়া হয়। চব্বিশের ১৭ জুলাই ছিল আশুরার দিন। প্রাথমিক প্ল্যান ছিল এদিন কোনো কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে না। সেদিন প্রথমবারের মতো নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গায়েবানা জানাজা হয়। তখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে, ছাত্রলীগ বনাম সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্য সব দল। অপরদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে হলে মারামারির কারণে ওই সময় ছাত্রলীগের ওপর জনরোষ তৈরি হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর সারা দেশে পুলিশ হামলা ও গুলি শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজিবি ঢুকে হল বন্ধ করে দেয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তিনি বলেন, ১৭ তারিখের এসব ঘটনার পর প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও হামলা হবে সেটা আঁচ করতে পেরে আমরা ঢাকাকে পাঁচটি সেক্টরে ভাগ করি। প্রথম সেক্টরে কুড়িল থেকে প্রগতি সরণি-নর্দা হয়ে নতুন বাজার পর্যন্ত। দ্বিতীয় সেক্টরে রামপুরা ও বাড্ডা অঞ্চল। এই দুটি সেক্টরে পুরোপুরি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব দিয়েছে। এ ছাড়া মিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানেও আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্ররা। তিনি বলেন, এই সেক্টর ডিভিশনের দুটি উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, নেতৃত্বের বিকেন্দ্রীকরণ করা; দ্বিতীয়ত, এই পয়েন্টগুলো বন্ধ করে ঢাকাকে সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছি।

আয়াতুল্লাহ বেহেস্তির ভাষায়, ১৮ জুলাই শুধু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সেদিন ছাত্রদের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনতাও নেমে আসে রাজপথে। তাই জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিরোধ দিবস এটি। সেদিন বাড্ডায় কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটির সামনে পুলিশের ওপর আক্রমণ তীব্র হলে র‌্যাব হেলিকপ্টার দিয়ে পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করতে বাধ্য হয়। ওই দিনই প্রগতি সরণির সামনে দাঁড়িয়ে নর্থ সাউথ-আইইউবিসহ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা প্রথম ‘এক দফা এক দাবি, শেখ হাসিনা কবে যাবি’ স্লোগান তোলে। সেদিনই পুলিশের গুলিতে নর্দান ইউনিভার্সিটির দুজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights