টানা লোকসানের মুখে চীনের শীর্ষ তিন বিমান সংস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

উৎসবের মৌসুম কিংবা বছরের সবচেয়ে লাভজনক সময়েও ভাগ্যের চাকা ঘুরল না চীনের আকাশসেবা খাতের। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ রুটে টিকিটের কম দাম এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ টাইফুনের তাণ্ডবে চরম বিপর্যয়ে পড়েছে চীনের শীর্ষ তিন বিমান সংস্থা। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে গত বছরের তুলনায় অবিশ্বাস্য মাত্রায় আয় কমে যাওয়ার পর এখন পুরো বছরজুড়েই বিশাল অঙ্কের নিট লোকসানের মুখে পড়তে যাচ্ছে এই এভিয়েশন জায়ান্টগুলো।

আর্থিক বিশ্লেষণের আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এলএসইজি-র সংকলিত বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনের দুই প্রধান রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা ‌‘এয়ার চায়না’ এবং ‘চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স’ করোনা মহামারির পর টানা সপ্তম বছরের মতো নিট লোকসান গুনতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, ‘চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স’ ২০১৯ সালের পর প্রথমবারের মতো গত ২০২৫ সালে মুনাফায় ফিরে এলেও বৈশ্বিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে চলতি বছরে তারা আবারও বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে।

চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে তিন বিমান সংস্থাই সামগ্রিকভাবে লোকসান হিসাব করেছে, অথচ ২০২৫ সালের এই একই সময়ে সংস্থা তিনটি বেশ মুনাফায় ছিল। সাধারণত তৃতীয় প্রান্তিক, যার মধ্যে গ্রীষ্মকালীন ছুটির সর্বোচ্চ ভ্রমণের সময়টি অন্তর্ভুক্ত থাকে, চীনা এভিয়েশন খাতের জন্য সবচেয়ে লাভজনক সময় হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি উল্টো। গত বছরের তুলনায় এয়ার চায়নার তৃতীয় প্রান্তিকের নিট মুনাফা ৯২.৬ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৭ কোটি ৬ লাখ ইউয়ানে (প্রায় ৪ কোটি ৬ লাখ ২০ হাজার মার্কিন ডলার)। আরও শোচনীয় অবস্থা চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্সের; ২০২৫ সালের তুলনায় সংস্থাটির চলতি প্রান্তিকের নিট মুনাফা ৯৮.২ শতাংশ ধসে মাত্র ৬ কোটি ৪০ লাখ ইউয়ানে নেমে এসেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্স; গত বছর এই প্রান্তিকে ৩৮৪ কোটি ইউয়ান নিট মুনাফা করা সংস্থাটি এবার উল্টো ৬০ কোটি ৯ লাখ ইউয়ানের নিট লোকসানে নিমজ্জিত হয়েছে।

এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বিমান জ্বালানির (জেট ফুয়েল) লাগামহীন দাম। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে ইরান বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে বিমান জ্বালানির দাম অর্ধেকেরও বেশি বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এশীয় ও ইউরোপীয় প্রতিযোগী বিমান সংস্থাগুলোর তুলনায় চীনা সংস্থাগুলো জ্বালানির আগাম দর নির্ধারণ বা হেজিং করে কম। ফলে তেলের মূল্যের এই আকস্মিক ও তীব্র ঊর্ধ্বগতির পুরো ধাক্কা সরাসরি গিয়ে পড়েছে তাদের আর্থিক খাতায়।

জ্বালানির বাড়তি খরচের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রুটে তীব্র প্রতিযোগিতাও চীনা সংস্থাগুলোকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। বিশেষ করে চীনের দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনের (হাইস্পিড রেল) সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে সংস্থাগুলো টিকিটের দাম বাড়াতে পারেনি, বরং অভ্যন্তরীণ ভাড়া ছিল বেশ নিম্নমুখী।

আর্থিক বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান হুয়াতাই সিকিউরিটিজ জানিয়েছে, এ সময়ে এয়ার চায়নার গড় ভাড়া প্রায় ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যার কারণে বাড়তি জ্বালানি খরচ উঠিয়ে আনা তাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি।

বিওএফএ গ্লোবাল রিসার্চের এশিয়া-প্যাসিফিক পরিবহন গবেষণাপ্রধান নাথান জি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন, জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের কারণে শীতকালীন চতুর্থ প্রান্তিকে চীনা বিমান সংস্থাগুলোর লোকসানের পাল্লা আরও ভারী হবে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, চরম মন্দা পূর্বাভাসের তুলনায় তৃতীয় প্রান্তিকের আয় সামান্য ভালো এসেছে। অক্টোবর মাসের গোল্ডেন উইক ছুটির পর সংস্থাগুলো কিছুটা সক্ষমতা বা সিট সীমিত রাখায় অভ্যন্তরীণ ভাড়া গত বছরের তুলনায় দ্বিঅঙ্কের হারে বাড়তে শুরু করেছে। তবে এত কিছুর পরও তেলের চড়া দামই প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাথান জি আরও সতর্ক করে জানান, অতিরিক্ত তেলের দাম ও দুর্বল ভোক্তা চাহিদার কারণে চীনা সংস্থাগুলোর মুনাফার মার্জিন চরম চাপের মুখে। বিমানগুলো আকাশে ওড়ানোর সময় বাড়িয়ে খরচ কিছুটা কমানোর চেষ্টা হলেও বড় কোনো ব্যয় সংকোচন এই মুহূর্তে তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন।

ব্যবসায়িক এই চরম মন্দা এবং লোকসানের খবরের স্পষ্ট প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও। চলতি বছরে এয়ার চায়না, চায়না ইস্টার্ন এবং চায়না সাউদার্ন এয়ারলাইন্সের শেয়ারের দাম যথাক্রমে ৩৮ শতাংশ, ৪৬ শতাংশ এবং ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমে গেছে।

সূত্র: রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights