ট্রাম্পের অবরোধের সামনে ইরানের টিকে থাকার কৌশল কি?

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বালু আর পারস্য উপসাগরের নীল জলরাশি এখন কেবলই বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন নৌবাহিনী যখন ইরানের প্রধান বন্দরগুলো ঘিরে ফেলেছে, তখন সারা বিশ্ব থমকে দাঁড়িয়ে দেখছে এক চরম অনিশ্চয়তার সংঘাত। তেহরান কি নতজানু হবে নাকি এই অবরোধের বিপরীতে গড়ে তুলবে অভেদ্য প্রতিরোধ, সেই প্রশ্নই এখন বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার রণকৌশল বদলে এবার সরাসরি ইরানের অর্থনীতির মেরুদণ্ড অর্থাৎ তেল রপ্তানির পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা করছে। হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ আর এফ-থার্টি ফাইভ যুদ্ধবিমানের মহড়া জানান দিচ্ছে যে, এবারের লড়াই শুধু বোমাবর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ট্রাম্পের হিসাব খুব পরিষ্কার, ইরানের তেলের পাইপলাইন টেনে ধরলে দেশটির শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ইরান বারবার প্রমাণ করেছে যে, চাপের মুখে তারা পিছু হটতে জানে না।

এদিকে তেহরানের অলিগলিতে এখন কেবলই যুদ্ধের প্রস্তুতি আর টিকে থাকার লড়াই। মার্কিন হামলায় ইরানের ইস্পাত আর পেট্রোকেমিক্যাল খাতের বিশাল ক্ষতি হলেও দেশটির শাসকরা এখনো অনড় অবস্থানে রয়েছেন। দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই অবরোধ আসলে মার্কিন জনগণের ওপরই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসবে। বিশেষ করে আমেরিকায় সামনে যখন নির্বাচন, তখন আকাশচুম্বী তেলের দাম সাধারণ ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তুলবে এবং ট্রাম্পকে শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য করবে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে অভিহিত করছেন একটি ‘ধৈর্যের পরীক্ষা’ হিসেবে। কারণ ইরান ইতিমধ্যেই কয়েকশ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ট্যাঙ্কারে ভরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ভাসিয়ে রেখেছে যেন তারা মাসের পর মাস এই অবরোধ সহ্য করতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করছেন যে আমেরিকা নিজেই প্রচুর তেল উৎপাদন করে বলে তাদের কোনো ভয় নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জ্বালানির উচ্চমূল্য শুধু আমেরিকা নয়, গোটা বিশ্বের অর্থনীতিকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই সংঘাতের আঁচ শুধু তেহরান বা ওয়াশিংটনে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ছে কাতার থেকে শুরু করে সুদূর এশিয়া ও আফ্রিকা পর্যন্ত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কাতারের মতো দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইউরোপের বিমানবন্দরগুলোতে জেট ফুয়েলের সংকট দেখা দিচ্ছে আর এশিয়ার কলকারখানাগুলো ধুঁকছে জ্বালানির অভাবে। একটি দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ পুরো পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রা যে কতটা কঠিন করে তুলতে পারে, তার সাক্ষী হয়ে থাকছে ২০২৬ সালের এই উত্তাল সময়।

যুদ্ধের ময়দানে ইরান এখন কেবল সরাসরি লড়াইয়ের দিকে তাকাচ্ছে না, বরং তাদের মিত্র হুথি বিদ্রোহীদের দিয়ে লোহিত সাগরে নতুন ফ্রন্ট খোলার হুমকি দিচ্ছে। এতে করে মার্কিন নৌবাহিনীর শক্তি দুই দিকে বিভক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংকীর্ণ পারস্য উপসাগরে আধুনিক ড্রোন আর ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে মার্কিন বিশালকায় যুদ্ধজাহাজগুলোও যে নিরাপদ নয়, তা সমরবিদরা বেশ ভালোভাবেই জানেন। প্রতিটি মুহূর্ত এখন এক চরম উত্তেজনার দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে সামান্য একটি ভুল পদক্ষেপ ডেকে আনতে পারে মহাপ্রলয়।

সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে চীনের অবস্থান। পারস্য উপসাগরে চীনের অর্ধশতাধিক জাহাজ মোতায়েন রয়েছে এবং তারা ওয়াশিংটনের এই অবরোধকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন নৌবাহিনী কি সত্যিই কোনো চীনা জাহাজে গুলি চালানোর সাহস দেখাবে? যদি তেমন কিছু ঘটে তবে তা আর কেবল ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ থাকবে না, বরং তা রূপ নিতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে। পরাশক্তিগুলোর এই ইগোর লড়াইয়ের মাঝে সাধারণ মানুষ এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে আছে।

দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights