ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতিতে যে পাঁচ বড় পরিবর্তন
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসননীতি বরাবরই ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্য ও নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০১৫ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার সময় থেকেই তিনি মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে মাদক ও অপরাধ যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অভিযোগ তুলে কঠোর অভিবাসননীতির পক্ষে অবস্থান নেন।
প্রথম মেয়াদে তার নেওয়া কিছু উদ্যোগ আদালতের বাধার মুখে পড়লেও দ্বিতীয় মেয়াদে কংগ্রেসের বিপুল অর্থায়ন এবং সুপ্রিম কোর্টের তুলনামূলক অনুকূল অবস্থানের সুযোগে সেই নীতি বাস্তবায়নে গতি এসেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে সীমান্ত বন্ধ করা এবং ব্যাপকভাবে অভিবাসীদের বহিষ্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ক্ষমতায় ফিরে সেই দুই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে কঠোর অভিযান মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অভিবাসননীতি তাই মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্পের অভিবাসননীতিতে পাঁচটি বড় পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
১. কার্যত বন্ধ হয়ে এসেছে দক্ষিণ সীমান্ত
জো বাইডেনের প্রেসিডেন্সির সময় যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তে অভিবাসীদের প্রবেশের চেষ্টা ব্যাপকভাবে বেড়েছিল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪৫ লাখের বেশি ‘এনকাউন্টার’ নথিভুক্ত হয়।
তবে বাইডেন প্রশাসনের শেষ দিকে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন সীমিত করা এবং অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে মাসিক সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর সীমান্তে অভিবাসীদের আগমন আরও কমেছে।
আশ্রয় আবেদন কার্যত স্থগিত রাখা, আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়ার নীতি বন্ধ করা, সীমান্তে সেনা মোতায়েন এবং মেক্সিকোর ওপর অভিবাসীদের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে চাপ সৃষ্টি- এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রশাসন সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করেছে।
১৬ অক্টোবর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কওয়েন মুলিন বলেন, সীমান্ত সুরক্ষিত করার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রমাণ সরকারি পরিসংখ্যানেই রয়েছে।
২. দ্রুত এগোচ্ছে সীমান্তপ্রাচীর নির্মাণ
যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো সীমান্তে প্রায় ৩ হাজার ২১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বড়, সুন্দর দেয়াল’ নির্মাণ ছিল ট্রাম্পের ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম। তার দ্বিতীয় মেয়াদে এ প্রকল্পে গতি এসেছে। ট্রাম্পের ‘ওয়ান বিগ বিউটিফুল’ ব্যয়সংক্রান্ত আইনে এ খাতে নতুন করে ৪৬৫০ কোটি ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্প ক্ষমতায় ফেরার আগে সীমান্তের কাছাকাছি মূল প্রাচীর নির্মিত ছিল প্রায় ৬৪৪ মাইল এবং আরও ভেতরে ছিল ৭৫ মাইল দ্বিতীয় স্তরের প্রাচীর। এরপর নতুন করে আরও ২৫০ মাইল প্রাচীর ও অন্যান্য প্রতিবন্ধক নির্মিত হয়েছে। আরও ১ হাজার ৪৪৩ মাইল প্রতিবন্ধক নির্মাণাধীন।
তবে এসব নির্মাণের কতটা নতুন এবং কতটা পুরোনো স্থাপনার উন্নয়ন, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন রয়েছে। তাদের মতে, সীমান্তে অনুপ্রবেশ কমার পেছনে প্রাচীরের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর নীতি ও বার্তার প্রভাব বেশি হতে পারে।
৩. আটক ও বহিষ্কার বেড়েছে ব্যাপকভাবে
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার (আইসিই) অভিযান ট্রাম্পের অভিবাসননীতির সবচেয়ে আলোচিত অংশ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়, যা রেকর্ড।
তবে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলে ও ইউসিএলএর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিপোর্টেশন ডেটা প্রজেক্টের তথ্যে দেখা যায়, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বড় অংশের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার রেকর্ড নেই। ওই মাসে অপরাধের ইতিহাস থাকা অভিবাসীদের আটক মোট আটকের ২৭ শতাংশে নেমে আসে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আইসিই প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ২৫৫ জনকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করছিল। বাইডেনের শেষ কয়েক মাসে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭৭০।
তবে অভিযানের ধরন নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মিনিয়াপোলিসে ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’ নামের দুই মাসের অভিযানে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনার জরিপে দেখা যায়, অভিবাসন ইস্যুতে রিপাবলিকানদের চেয়ে ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা রাখছেন ভোটাররা।
৪. শরণার্থী গ্রহণ ও মানবিক সুরক্ষা সংকুচিত
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর ট্রাম্প শরণার্থী গ্রহণ স্থগিত করেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানারদের জন্য সীমিত পরিসরে এ প্রক্রিয়া পুনরায় চালু করা হয়। ২০২৬ অর্থবছরে শরণার্থী গ্রহণের সর্বোচ্চ সীমা প্রথমে ৭ হাজার ৫০০ নির্ধারণ করা হলেও পরে তা বাড়িয়ে ১৭ হাজার ৫০০ করা হয়।
কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ওই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা ১৬ হাজার ২৯২ জন শরণার্থীর মধ্যে ১৬ হাজার ২৮৭ জনই দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। এর বিপরীতে বাইডেন প্রশাসনের শেষ দুই অর্থবছরে যথাক্রমে ৬০ হাজার ও ১ লাখ শরণার্থী যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন।
এছাড়া সাময়িক সুরক্ষিত মর্যাদা বা টিপিএস বাতিলের ফলে কয়েক লাখ মানুষ বহিষ্কারের ঝুঁকিতে পড়েছেন। নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়- এমন বিদেশিদের যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস ও কাজের সুযোগ দিত এই ব্যবস্থা। জুনে সুপ্রিম কোর্ট প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হাইতীয় নাগরিকের জন্য এ সুরক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
৫. ভিসায় কড়াকড়ি, ধনীদের জন্য বিশেষ সুযোগ
নিরাপত্তাঝুঁকির কথা উল্লেখ করে কয়েক ডজন দেশের নাগরিকদের জন্য ভিসা ও ভ্রমণে পূর্ণ বা আংশিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গ্রিন কার্ডের আবেদনপ্রক্রিয়ায় নতুন নিয়ম এবং বাড়তি যাচাই-বাছাইয়ের কারণে বৈধ অভিবাসনের পথও কঠিন হয়েছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন এইচ-১বি ভিসায় ১ লাখ ডলার ফি আরোপের ঘোষণা প্রযুক্তি খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এসব ভিসার বড় অংশই ভারতীয় কর্মীরা ব্যবহার করেন। ২০২৭ সালের জন্য ভিসা নিবন্ধন ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন নাগরিকত্ব ও অভিবাসন পরিষেবা। আদালত আপাতত ওই ফি আটকে দিলেও এর প্রভাব নিয়োগদাতাদের সিদ্ধান্তে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ধনীদের জন্য চালু হয়েছে ‘ট্রাম্প গোল্ড কার্ড’। ২০২৫ সালে চালু হওয়া এ কর্মসূচিতে ১৫ হাজার ডলারের ফেরত-অযোগ্য আবেদন ফি ছাড়াও মার্কিন সরকারকে ১০ লাখ ডলার উপহার দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে কর্মসূচিটির সাড়া এখনও সীমিত। এপ্রিল পর্যন্ত মাত্র একজন আবেদনকারী অনুমোদন পেয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এভাবে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, বহিষ্কার ও ভিসায় কড়াকড়ির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন কমানোর চেষ্টা চালালেও এর অর্থনৈতিক প্রভাব, মানবিক পরিণতি এবং আইন প্রয়োগের পদ্ধতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে। সূত্র: বিবিসি
