ট্রাম্পের ‘চরম অর্থনৈতিক অবরোধ’ ইরানকে কাবু করতে পারবে কি?

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের তড়িৎ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন চরম অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। সামরিক উপায়ে জয় লাভ কিংবা কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা দিন দিন ফিকে হয়ে আসায় এখন এক নতুন চরম কৌশলের দিকে ঝুঁকছে ওয়াশিংটন।

চলমান এই সামরিক ও কূটনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ (চরম অর্থনৈতিক অবরোধের নীতি)। এই নীতি অনুযায়ী, বিশ্বের যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে কোনো প্রকার লেনদেন বা ব্যবসা অব্যাহত রাখলে তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘ভয়াবহ’ অর্থনৈতিক পরিণতির মুখে পড়তে হবে।

তবে মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সহ্য করে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া ইরানের বিরুদ্ধে এই নতুন অর্থনৈতিক আক্রমণ শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে?

ইরানের অর্থনীতি ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর থেকেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি। তবে পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়ে আসেন। বিদ্যমান সংকটের মধ্যেও মার্কিন প্রশাসন ইতোমধ্যে ‘অপারেশন ইকোনমিক ফিউরি’ নামের একটি বহুমুখী চাপ প্রয়োগের কৌশল চালু রেখেছে, যেখানে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের মাধ্যমে তেহরানের রাজস্ব প্রবাহ বন্ধ করার পাশাপাশি ইরানি সমুদ্রবন্দরে নৌ-অবরোধও আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটনের এসব পদক্ষেপেও তেহরানকে নতিস্বীকার করানো সম্ভব হয়নি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের জিওস্ট্রেটেজি বিশেষজ্ঞ এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক নীতি উপদেষ্টা ইমরান বায়ুমীর মতে, এই নতুন ঘোষণা আসলে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্য কৌশলগুলো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে না পারার এক চরম হতাশার বহিঃপ্রকাশ। তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই যুদ্ধে একধরনের অচলাবস্থায় আটকে গেছে এবং কোনো স্পষ্ট দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ছাড়া কেবল অর্থনৈতিক হাতিয়ার পরিবর্তন করে সার্বিক পরিস্থিতি বদলানো কঠিন হতে পারে।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের বিদেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক দফতর (ওএফএসি)-এর আট বছরের অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ মাইকেল পার্কারের মতে, ট্রাম্পের এই ‘ইকোনমিক ডি-ডে’ কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো নিষেধাজ্ঞার প্রভাব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, সরাসরি ইরানকে নিশানা করার পাশাপাশি যেসব তৃতীয় দেশ বা আন্তর্জাতিক ব্যাংক মার্কিন ডলার নির্ভর ব্যবসা পরিচালনা করার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বজায় রাখছে, তাদের এবার সরাসরি মার্কিন ব্যবস্থার আওতায় এনে ব্ল্যাকলিস্ট করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

তবে ওয়াশিংটনের এই নতুন আক্রমণ সামলাতে ইরান কতটা প্রস্তুত, তাও বড় বিবেচ্য বিষয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান বছরের পর বছর ধরে বেআইনি বা বিকল্প পথে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এক অসাধারণ কৌশলগত দক্ষতা অর্জন করেছে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের রফতানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হামুদার মতে, ইরান ‘শ্যাডো ভেসেল’ বা ছায়ানৌবহর ব্যবহার করে তেল পরিবহন এবং কাগুজে ভুয়া বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ এড়িয়ে চলে। নিষেধাজ্ঞা আরোপকারী সংস্থাগুলো যখনই নতুন নাম সনাক্ত করে, ততক্ষণে ইরান ব্যবসা চালানোর জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো আন্তর্জাতিক পথ বা কোম্পানি গড়ে তোলে, যার ফলে আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থাগুলোকে সার্বক্ষণিক দৌড়ের ওপর থাকতে হয়।

এই সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ কতটুকু সফল হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে চীন, তুরস্ক কিংবা ইরাকের মতো তেহরানের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারদের প্রতিক্রিয়ার ওপর। মাইকেল পার্কার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে চায়, তবে তা বাস্তবায়নের বড় অংশই নির্ভর করবে এসব তৃতীয় দেশের ওপর, তারা মার্কিন ডলার নির্ভর বিশ্ব ব্যাংকিং ব্যবস্থার শাস্তির ভয়ে ওয়াশিংটনের নীতি মেনে চলবে নাকি ইরানকে ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া অব্যাহত রাখবে।

বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ সংশয় প্রকাশ করে বলছেন, চীন বা ভারতের মতো পরাশক্তি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক শক্তিগুলো হঠাৎ করে যুক্তরাষ্ট্রের সব নির্দেশ মেনে চলবে, এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ওয়াশিংটন যদি সুনির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট সামরিক কিংবা কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া শুধুই অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে যাওয়ার নীতিতে অটল থাকে, তবে বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি হলেও তা শেষ পর্যন্ত মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে খুব বেশি অবদান রাখতে পারবে না বলে মনে করছেন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিবিদরা।

বিবিসির বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights