ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার শঙ্কা

জয়শ্রী ভাদুড়ী

হাতে লাগানো ক্যানুলা দিয়ে চলছে স্যালাইন। গায়ে জ্বর। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি মালিহা তাহসিন (১২)। সে জানায়, তার ছোট ভাই আবদুল্লাহ (৮), মা রাশিদা বেগমও এই হাসপাতালে ভর্তি। প্রথমে আবদুল্লাহর জ্বর আসে। এরপর মালিহা। তারপর তার মা আক্রান্ত হন। আব্দুল্লাহর প্লাটিলেট কমতে থাকায় দুশ্চিন্তায় তারা। মালিহার পরিবারের বসবাস রাজধানীর মিরপুর-১১ নম্বরে।

সরেজমিনে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের তিন তলার ডেঙ্গু ওয়ার্ডে রোগীদের ভিড়। কারও তীব্র জ্বর, কারও কমে যাচ্ছে প্লাটিলেট। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গতকাল নতুন করে আরও ভর্তি হয়েছেন ১১ জন। সবমিলিয়ে ভর্তি ছিলেন ৭১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, জুলাইয়ে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ২০৬ জন। মারা গেছেন ৩৬ জন। জুনে আক্রান্ত ছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন। এক মাসের ব্যবধানে জুলাইয়ে আক্রান্ত বেড়েছে ৬ হাজার ২৯৯ জন, যা জুনের তুলনায় প্রায় ২১৭ শতাংশ বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১৫৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। খুলনা বিভাগে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগ ও সিটি করপোরেশন এলাকায়। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় ৫০, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৫ জন ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬৯ এবং বরিশাল ও খুলনায় চারজন করে রোগী ভর্তি হয়েছেন।

প্রতিদিনই রাজধানীসহ সারা দেশের হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর ভিড়। আগস্টে ডেঙ্গু আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে। থেমে থেমে বৃষ্টিতে পানি জমে এডিস মশার প্রজননস্থল বাড়ছে। বছরের প্রথম ছয় মাসের চেয়ে জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে শুধু আগস্ট নয়, আগামী তিন মাসেও বাড়বে ডেঙ্গুর প্রকোপ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশনের গবেষণায় আমরা একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছি। এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি তৈরি করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারী বৃষ্টিপাতের সময় এডিস মশার ঘনত্ব কিছুটা কমলেও বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার দুই থেকে চার সপ্তাহ পর মশার সংখ্যা দ্রুত বাড়ে। তার দুই সপ্তাহ পর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বর্তমানে যে তুলনামূলক স্বস্তি দেখা যাচ্ছে, এটি সাময়িক। আগস্ট, সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবরে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, উৎস ধ্বংস ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব, দ্রুত নগরায়ণ, বহুতল ভবন নির্মাণ, নির্মাণাধীন স্থাপনা, বেসমেন্টে পানি জমে থাকা, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের ব্যাপক চলাচল ঢাকাকে ডেঙ্গু সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও কক্সবাজারে দীর্ঘস্থায়ী বর্ষা, অধিক আর্দ্রতা এবং বৃষ্টির পরে বিভিন্ন পাত্রে পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। গাজীপুর ও নরসিংদী ঢাকার সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং দ্রুত নগরায়ণের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে গতানুগতিক পরিস্থিতিতে হাঁটছে সরকার। কমিউনিটি পর্যায়ে যোগাযোগ বাড়ালে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ফলপ্রসূ হবে। এলাকার মানুষকে সংযুক্ত করে মশার বংশবিস্তার খুঁজে বের করে ধ্বংস করা, রোগী চিহ্নিত করে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। লার্ভিসাইডিংয়ে জোর দিতে হবে। বিকালে শুধু ধোঁয়া দিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights