ঢাকা দক্ষিণের ২৭ ওয়ার্ড ডেঙ্গুর মারাত্মক ঝুঁকিতে

হাসান ইমন

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত প্রাক-বর্ষা এডিস মশার লার্ভা জরিপে দেখা যায়, রাজধানীর বড় একটি অংশ ডেঙ্গুর মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। জরিপে ঢাকা দক্ষিণ সিটির মোট ২৭টি ওয়ার্ডকে লার্ভার উচ্চ ঘনত্বের কারণে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ এবং ৩৬টি ওয়ার্ডকে ‘মাঝারি ঝুঁঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সম্ভাব্য ডেঙ্গু মহামারি রুখতে আগামী শনিবার থেকে করপোরেশনের সবকটি ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ডে একযোগে বিশেষ ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে নগর কর্তৃপক্ষ।

জানা যায়, চলতি বছরের মে মাসে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রথাগত রিপোর্টের ওপর নির্ভর না করে ডিএসসিসি প্রশাসন প্রথমবারের মতো নিজস্ব বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনায় এই প্রাক-বর্ষা লার্ভা জরিপ সম্পন্ন করেছে। জরিপটি ১২ মে থেকে শুরু হয়ে চলে ২৩ মে পর্যন্ত। সম্পূর্ণ আধুনিক ও ডিজিটাল প্রযুক্তি ‘কবো টুলবক্স’ অ্যাপ ব্যবহার করে এই ডেটা সংগ্রহ করা হয়, যা মাঠপর্যায়ের লার্ভা পরিস্থিতির নিখুঁত এবং বাস্তবসম্মত চিত্র তুলে এনেছে। ডিএসসিসি সূত্রে জানা গেছে, এই বিশেষ জরিপটি দক্ষিণ সিটির মোট ৭৫টি ওয়ার্ডে একযোগে পরিচালিত হয়েছে। সম্পূর্ণ দৈবচয়ন ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে ১২ দিনব্যাপী জরিপে ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার মোট ৩৬ জন মাঠকর্মী অংশ নিয়েছেন। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে ৩০টি করে মোট ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে নমুনা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ডিএসসিসির নিজস্ব স্বাস্থ্যকর্মী এবং কীটতত্ত্ববিদদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দল প্রতিটি বাড়িতে গিয়ে জমানো পানির পাত্র ও লার্ভার উপস্থিতি পরীক্ষা করে। পরীক্ষা শেষে সংগৃহীত নমুনার লার্ভা ঘনত্ব এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সূচক ব্রেটো ইনডেক্স ও হাউস ইনডেক্স বিশ্লেষণ করে এই ঝুঁকিভিত্তিক মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ১২টি ওয়ার্ড তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে রয়েছে। ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ২৭টি ওয়ার্ডে মশার প্রজননহার বিপজ্জনক সীমা (ব্রেটো ইনডেক্স ২০-এর ওপরে) ছাড়িয়ে গেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ ২৭ ওয়ার্ড : অঞ্চল-১ এর ১৫, ১৭, ২০ ও ২১ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-২ এর ২, ৪, ৫, ৬, ৯, ১১ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৩ এর ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড। অঞ্চল-৪ এর ৩২, ৩৬ ও ৩৮ নম্বর ওয়ার্ড। এ ছাড়া অঞ্চল-৫ এর ৭ ও ৫২ নম্বর ওয়ার্ড, অঞ্চল-৭ এর ৭৩, অঞ্চল-৮ এর ৬৮, অঞ্চল-৯ এর ৬২ নম্বর ওয়ার্ড অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে অঞ্চল-১ এর ১৯ নম্বর ওয়ার্ড, অঞ্চল-২ এর ১, ৩, ১০ ও ১২ নম্বর ওয়ার্ড, অঞ্চল-৩ এর ১৪, ২২ ও ২৯ নম্বর ওয়ার্ড, অঞ্চল-৪ এর ৩০, ৩১, ৩৩, ৩৪, ৩৫, ৪২ ও ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড। পাশাপাশি অঞ্চল-৫ এর ৩৯, ৪০, ৪৪, ৪৫, ৪৬, ৪৭, ৪৯, ৫০, ৫১ ও ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড, অঞ্চল-৬ এর ৭০ ও ৭৪, অঞ্চল-৭ এর ৭১ ও ৭২, অঞ্চল-৮ এর ৬৬ ও ৬৭, অঞ্চল-৯ এর ৬৫ এবং অঞ্চল -১০ এর ৫৮, ৫৯, ৬০ ও ৬১ নম্বর মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এসব ওয়ার্ডে বহুতল ভবনের ছাদবাগান, বেজমেন্টের গাড়ি ধোয়ার জায়গা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের ড্রাম এবং ডাবের খোসায় সবচেয়ে বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই ক্র্যাশ প্রোগ্রামের আওতায় প্রথাগত মশক নিধন কার্যক্রমের চেয়ে চার গুণ বেশি জনবল ও ওষুধ ব্যবহার করা হবে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে সকালের শিফটে প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলি এবং ভবনের ভিতরে লার্ভিসাইডিং (লার্ভা ধ্বংসকারী বিশেষ তরল ওষুধ ছিটানো) হবে। আর বিকালে উড়ন্ত মশা ধ্বংসের জন্য ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানোর কার্যক্রম চালানো হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights