ঢাবিতে উপড়ে পড়ল কৃষ্ণচূড়া গাছ, ঝুঁকিতে আরও ২ হাজার ২১৩টি গাছ

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

তুমুল বর্ষণের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন–সংলগ্ন মলচত্বরে একটি পরিণত কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে পড়েছে। এতে অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঝুঁকিপূর্ণ গাছ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক বৃক্ষ শুমারি বলছে, ক্যাম্পাসে থাকা ১৭ হাজার ১৬১টি গাছের মধ্যে ২ হাজার ২১৩টি বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গাছের বড় একটি অংশ যেকোনো সময় ভেঙে পড়ে দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবরিকালচার সেন্টারের উদ্যোগে পরিচালিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষ শুমারিতে দেখা গেছে, ক্যাম্পাসে ৬২ গোত্রের ২৭৭ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ দেশি এবং ৪২ শতাংশ বিদেশি প্রজাতির। সবচেয়ে বেশি থাকা ১৫টি প্রজাতির মধ্যে পাঁচটি বিদেশি—মেহগনি, দেবদারু, ম্যাকারথুরি পাম, রেইনট্রি ও সেগুন।

জরিপে আরও উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছগুলোর মোট ভূ-উপরিভাগীয় জীবভর প্রায় ৯ হাজার ৯০০ টন এবং কার্বন মজুত প্রায় ৪ হাজার ৬৫০ টন। উপযোগিতার ভিত্তিতে ২৫ শতাংশ গাছ ফলদ, ২২ শতাংশ বন্যপ্রাণীবান্ধব, ২১ শতাংশ ঔষধি, ২০ শতাংশ কাঠ উৎপাদনকারী এবং ১২ শতাংশ শোভাবর্ধনকারী।

আরবরিকালচার সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, মলচত্বর, ফুলার রোড এবং প্রক্টর অফিস–সংলগ্ন আমতলা এলাকায় ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা গাছের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া নীলক্ষেত তোরণ, ভিসি চত্বর, টিএসসি, মোকাররম ভবন ও কার্জন হল–সংলগ্ন কয়েকটি বড় গাছও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তিনি জানান, বিশেষ করে বিদেশি প্রজাতির রেইনট্রি, দেবদারু ও ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

বৃক্ষ শুমারিতে দেখা গেছে, ১ হাজার ৫২টি গাছের মুকুট ভবন বা অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে লেগে আছে। ৭২২টি গাছ বিদ্যুতের তারের খুব কাছে অবস্থান করছে। ৪০২টি গাছ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে, যা ঝড়-বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

এ ছাড়া ৫৬৯টি গাছের শিকড় কংক্রিট, সড়ক বা দেয়ালের কারণে স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারছে না। ৫১৪টি গাছে পরগাছা, ১৫৯টিতে পেরেক ঠুকে পোস্টার লাগানো হয়েছে। জরিপে ৯৪টি মৃত, ৭৭টি রোগাক্রান্ত এবং ৪৩টি গাছের বড় ডাল ভেঙে পড়ার ঝুঁকির তথ্যও উঠে এসেছে।

অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে অধিকাংশ গাছ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কংক্রিটের কারণে গাছের শিকড় স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারছে না এবং খাদ্য গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার মতে, সব কংক্রিট সরিয়ে ফেলা এখন বাস্তবসম্মত নয়। তাই যেসব গাছ আর সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়, সেগুলো অপসারণ করে নতুন গাছ লাগানোই আপাতত কার্যকর সমাধান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, আরবরিকালচার সেন্টারকে ঝুঁকিপূর্ণ গাছগুলোর অবস্থান মানচিত্র আকারে দিতে বলা হয়েছে। সংরক্ষণযোগ্য গাছ সংরক্ষণ করা হবে, আর যেগুলো রক্ষা করা সম্ভব নয়, সেখানে নতুন গাছ প্রতিস্থাপন করা হবে।

তিনি বলেন, ‘সবুজ ক্যাম্পাস রক্ষা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি শিক্ষার্থী ও পথচারীদের নিরাপত্তাও সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, মলচত্বরে কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে পড়ার ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, পরিকল্পিত নগরায়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights