থামছেই না নদীর কান্না

শামীম আহমেদ

ঢাকার চারপাশ ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু-নগরীর ধমনিখ্যাত এই চার নদীর কান্না থামছেই না। ক্রমেই বিষে ভরে উঠছে এর পানি। প্রশ্ন উঠছে-এত আইন, এত সংস্থা, হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প থাকার পরও কেন নদীর মৃত্যু ঠেকানো যাচ্ছে না? কার অবহেলায় প্রতিদিন কালো হয়ে উঠছে নদীর পানি? নদী রক্ষার নামে এত আয়োজন আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করছে?

সরেজমিন দেখা গেছে, বুড়িগঙ্গা, বালু ও তুরাগ নদীতে কোথাও কালো, কোথাও রঙিন তরল বর্জ্য অবাধে পড়ছে। স্যুয়ারেজ লাইনের মুখেও কোনো পরিশোধন ব্যবস্থা নেই। আধা কিলোমিটার দূর থেকেও বাতাসে ভেসে আসছে তীব্র দুর্গন্ধ। স্থানীয়দের ভাষায়, বর্ষার পর থেকে দূষণ ক্রমাগত বাড়ছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ২০২৩ অনুযায়ী তরল বর্জ্য নির্গমনকারী সব শিল্পকারখানায় ইটিপি ও এসটিপি চালু রাখা বাধ্যতামূলক। বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বহু কারখানা ইটিপি স্থাপনই করেনি, আবার যেগুলো করেছে সেগুলোর বড় অংশ নিয়মিত চালু রাখে না। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে যাচ্ছে।

শিল্পকারখানাপরিবেশ অধিদপ্তর গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর ২ হাজার ৪৬টি শিল্পকারখানাকে চূড়ান্ত নোটিস দেয়। নোটিসে ইটিপি সার্বক্ষণিক চালু রাখা এবং পরিবেশ আইন মেনে কারখানা পরিচালনা না করলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। নোটিসের ১০ মাস পরও নদীর পানিতে দৃশ্যমান কোনো উন্নতি চোখে পড়েনি। উল্টো দূষণ আরও বেড়েছে। প্রশ্ন হলো-নোটিসের পর কয়টি কারখানা বন্ধ হয়েছে, কয়টিতে জরিমানা আদায় হয়েছে? এই তথ্য প্রকাশ্যে নেই।

নদীর পানির মান পরীক্ষার ফলাফল আরও উদ্বেগজনক। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) পরীক্ষায় দেখা যায়, শিল্পাঞ্চলঘেঁষা নদীগুলোতে জলজ প্রাণী বাঁচার মতো দ্রবীভূত অক্সিজেন নেই। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্রতি লিটার পানিতে যেখানে কমপক্ষে ৬.৫ মিলিগ্রাম ডিও প্রয়োজন, সেখানে বুড়িগঙ্গায় পাওয়া গেছে মাত্র ০.৮৫ মিলিগ্রাম, তুরাগে ১.১, বালুতে ১.৫ এবং শীতলক্ষ্যায় ০.৭৫ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ নদীগুলো কার্যত মৃত জলাধারে পরিণত হয়েছে।

দূষণের আরেক বড় উৎস পয়োবর্জ্য। ‘ইন্টারন্যাশনাল টয়লেট কনফারেন্স ২০২৫’-এর তথ্যমতে, দেশে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ নিরাপদ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বাইরে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ২৩০ টন মানববর্জ্য উন্মুক্ত জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, অনুন্নত পয়োনিষ্কাশনের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ৪.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্যেও। নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোতে চর্মরোগ, ডায়রিয়া, কলেরা, আমাশয় ও টাইফয়েড এখন নিয়মিত রোগে পরিণত হয়েছে। অথচ ২০০৯ সালেই ঢাকার চার নদীকে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্যাল এরিয়া ঘোষণা করা হয়েছিল। দেড় দশক পরও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা নেই।

ঢাকার বাইরেও চিত্র একই। রাজশাহীর বারনই নদী হাসপাতাল ও শিল্পকারখানার বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়েছে। এতে তিন উপজেলার অন্তত ১ লাখ মানুষ চর্মরোগে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘ইটিপি যদি নিয়মিত চালু থাকত, নদীর পানি এমন কালো হতো না। নির্দেশ কাগজে থাকে, বাস্তবে প্রয়োগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নদী রক্ষার দায়িত্ব বহু সংস্থার মধ্যে ভাগ হয়ে যাওয়ায় কেউ দায় নিচ্ছে না। অন্যদিকে সুপারিশ করা ছাড়া নদী রক্ষা কমিশনের কার্যত কোনো ক্ষমতা নেই। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে আছে কি না সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। নদী রক্ষায় এমন একটা প্রতিষ্ঠান দরকার, যে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারবে। ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা থাকতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে যেসব উদ্যোগ নিয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা থাকলে নদী ও পরিবেশে পরিবর্তন আসত। তবে তারা অন্য অনেক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। নিয়মিত তদারকির অভাবে ফলাফল শূন্য। যদিও চট্টগ্রামে নদী উদ্ধারে ঢাকা থেকে উপদেষ্টা বা মন্ত্রীদের গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, এমন কথা নেই। আইন অনুযায়ী দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করবে। কিন্তু তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবে সেটা হচ্ছে না।

পরিবেশবিদদের মতে, নদী রক্ষার নামে প্রকল্প হচ্ছে, অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি নেই। যতদিন শক্তিশালী কর্তৃত্ব, সমন্বয় ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত না হবে, ততদিন নদীর কান্না থামবে না। আর নদী না বাঁচলে বাংলাদেশও বাঁচবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights