দুই পথেই ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম
বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ এবং থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া থেকে দেশে ঢুকছে একের পর এক অস্ত্রের চালান। স্থল ও বঙ্গোপসাগরের অরক্ষিত অন্তত ১৫টি রুটে আসছে এসব চালান। এই মারণাস্ত্রের কারবারে মাফিয়ারা হুন্ডির বদলে ব্যবহার করছে ট্র্যাকিং-অযোগ্য ডিজিটাল মুদ্রা। ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে লাখ থেকে কোটি টাকার লেনদেন করছে। মূল পেমেন্ট থাইল্যান্ড মিয়ানমার গেটওয়ে দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তর হচ্ছে। এ ডিজিটাল মুদ্রা এমনভাবে ডিজাইন করা, প্রেরককে শনাক্ত করা যায় না। বাংলাদেশে বর্তমানে শত শত মার্চেন্ট সক্রিয়, যারা প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচা করে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, এ অঞ্চলে অস্ত্র কারবারের অনেকাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো। তারা অস্ত্র সরবরাহের বিনিময়ে অর্থ আয় করছে। যা দিয়ে সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহ করছে। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, সিন্ডিকেটগুলোর চেইন ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র কারবারিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে ভয়ংকর পরিস্থিতি বরণ করতে হবে বাংলাদেশকে।
পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম রেঞ্জ এবং সিএমপিতে অস্ত্র আইনে মামলা হয় ৫৪৮টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৬২৪টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩০২টি মামলা হয় অস্ত্র আইনে। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি (ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট) নাজমুল হাসান বলেন, রেঞ্জের প্রত্যেক ইউনিট নিরলসভাবে অস্ত্র উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে।
জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার সীমান্ত দেশে অস্ত্র প্রবেশের অন্যতম দ্বার হিসেবে ব্যবহার করছে মাফিয়ারা। জল ও স্থলপথে গড়ে তোলা হয়েছে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। এ অঞ্চলের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের জোগান আসে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের দুর্গম সীমান্তের ‘ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল’ থেকে। অন্ধকার এ জগতে উৎপাদন হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার হয়েই ঢুকছে রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজারে। এ তিন জেলার কমপক্ষে ১৫টি রুট হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে অবৈধ অস্ত্র। চীন থেকে আসা অস্ত্র অনেক ক্ষেত্রে ভারতকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে স্থলপথে বাংলাদেশে ঢুকছে। স্থলপথে ভারত ও মিয়ানমার থেকে সরাসরি অস্ত্র এলেও থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া থেকে অস্ত্র ঢুকছে মূলত সমুদ্রপথে। সাগরপথে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ‘সি-রুট’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ‘কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড-আন্দামান সাগর-কক্সবাজার’ সার্কিট। বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অস্ত্রের এসব চালান মূলত চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর এবং চাঁদপুরের উপকূলীয় এলাকা দিয়ে দেশে ঢুকছে। এসব চালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে সন্দ্বীপের বিভিন্ন চর। বর্ডার রুটের পাশাপাশি কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপ এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা স্থানীয় কারখানায়ও তৈরি হচ্ছে প্রাণঘাতী অস্ত্র। মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে- বাজারে চাহিদার ওপর ভিত্তি করে আন্ডারওয়ার্ল্ডে অস্ত্রের দাম ওঠানামা করে। একাধিক হাতবদল হওয়ার কারণে অস্ত্রের দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দেশি বা সীমান্ত পার হয়ে আসা ওয়ান শুটারগান বা এলজি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। সাধারণ মানের পিস্তল ও রিভলবারের দাম ৪০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। একে সিরিজের অস্ত্র, ৭.৬২ মিমি পিস্তলের ক্ষেত্রে এই দাম ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। কার্তুজ বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।
