দেশ ও জাতির সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত তওবা
মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
দেশ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত মানে নেই। খুন-রাহাজানি-মাদকে দেশ ছেয়ে গেছে। ভেজাল খাদ্য, পরিবেশ বিপর্যয়, ওজনে কম দেওয়া, অন্যকে ঠকানো এখন আমাদের জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। আমরা কথা বললে মিথ্যা বলি। ওয়াদা করলে ভঙ্গ করি। নিজে যা বলি তা আমল করি না। এমন গভীর সংকটে কারণে প্রতিটি মানুষই কোনো না কোনোভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ঘরে ঘরে ডেঙ্গুর হানা, বাজারে আগুন, সড়ক দুর্ঘটনা, বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের ভোগান্তিকে বাড়িয়ে তুলেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার হওয়ার একটাই পথ, সেটা হলো তওবা।
ব্যক্তিগত তওবার পাশাপাশি সম্মিলিত তওবা প্রয়োজন। আল্লাহতায়ালা কোরআনে ব্যক্তিগত তওবার নির্দেশ যেমন দিয়েছেন, একই সঙ্গে দিয়েছেন সম্মিলিত তওবার আদেশও। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিন সমাজ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর। তাহলে তোমরা সফলকাম হবে।’ (সুরা নুর : আয়াত-৩১)। সফলকাম হওয়ার জন্য প্রয়োজন সত্যিকারের তওবা। আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীরা! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি-বিশুদ্ধ তওবা কর। আশা করা যায়, তামাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কর্মগুলো ক্ষমা করে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদীমালা প্রবাহিত।’ (সুরা তাহরিম : আয়াত-৮)। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) খাঁটি তওবা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘খাঁটি তওবা হলো, গুনাহ করার পর অনুতপ্ত হওয়া এবং অনুতপ্ত মন নিয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করা। পরে আর সে গুনাহ না করা।’ (তাম্বিহুল গাফেলিন : প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯৫)।
একটা জাতি যখন পচে যায়, গলে যায়, নষ্ট হয়ে যায়, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তখন সফলতার একমাত্র ওষুধ হলো তওবা, সম্মিলিত তওবা। যে যেখানে আছে সেখান থেকে তওবা করা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি থেকে শুরু করে একজন মেথর-সবাইকেই আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় ইমাম থেকে শুরু করে একজন কৃষক সবাই যখন নিজ নিজ ভুল উপলব্ধি করতে পারবেন এবং সে ভুল থেকে বের হয়ে এসে স্বচ্ছ জীবন ও কর্ম শুরু করবেন তখনই আল্লাহতায়ালা আসমানের দুয়ার ওই জাতির জন্য খুলে দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি দেশের মানুষ ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি অবশ্যই তাদের ওপর আসমান-জমিনের সমৃদ্ধি ও শান্তির দুয়ারগুলো খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। ফলে তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদের পাকড়াও করলাম।’ (সুরা আরাফ : আয়াত-৯৬)।
মনে রাখতে হবে, মানুষমাত্রই ভুল। কিন্তু সে ভুলের ওপর টিকে থাকা মানুষের কাজ নয়। চলার পথে ভুল হয়ে যাবে। লোভের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলবে। অন্যায় কিছু ঘটে যাবে। কিন্তু সে অন্যায়কে বেশি দিন বেশি দূর এগোতে না দেওয়াটাই মুমিনের ধর্ম। যদি মানুষ ভুল করার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। আল্লাহ বলেন, ‘তারা সেসব লোক, যারা কখনো কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে কিংবা অন্য কোনোভাবে নিজেদের প্রতি জুলুম করলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করতে পারে? এবং তারা যা অপরাধ করে ফেলেছে, তাতে জেনে-শুনে অটল থাকে না।’ (সুরা আল ইমরান : আয়াত-১৩৫)।
এক হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রসুল (সা.) বলেছেন, ‘তওবাকে আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিনের মাঝমাঝি ঝুলিয়ে রেখেছেন। সে প্রতিদিন মানুষকে ডাকতে থাকে। সে বলে, হে দুনিয়ার গুনাহগার! তোমরা ক্ষমা চাও। ক্ষমা চাইলেই সফল হবে। এভাবে পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উদয় না হওয়া পর্যন্ত তওবার ডাকাডাকি চলতে থাকে। সূর্য উদয় হলে আল্লাহ তওবাকে নিজের কাছে তুলে নেবেন।’ (তাম্বিহুল গাফেলিন : প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯৬)। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত-‘একদিন নবীজি (সা.) তওবার দরজা সম্পর্কে আলোচনা করলেন। হজরত ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তওবার দরজা কী? নবীজি (সা.) বললেন, তওবার দরজার বিস্তৃতি হলো পূর্ব দিগন্ত থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত। এর কপাটগুলো ইয়াকুত ও মুক্তাখচিত স্বর্ণের তৈরি। এর এক কপাট থেকে আরেক কপাটের দূরত্ব ৪০ বছরের রাস্তার সমান। সৃষ্টির শুরু থেইে দরজা তওবাকারীদের জন্য খোলা রয়েছে। যখন কোনো বান্দা তওবা করে তখন এ দরজা দিয়ে তওবা আল্লাহর কাছে যায়। কেয়ামতের আগে যখন পশ্চিম দিক থেকে সূর্য উঠবে তখন আল্লাহ তওবার দরজাটি বন্ধ করে দেবেন।’ (তাম্বিহুল গাফেলিন : প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা-১৯৫)।
