দ্বিকক্ষের সংসদ, হবে ইসির বিচার
গোলাম রাব্বানী
বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্বে থাকা নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের বিচারের আওতায় আনতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন, তিন নির্বাচনের অনিয়মের তদন্ত; ‘না ভোটের’ প্রচলন; দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ; ইভিএমে ভোট গ্রহণ না করার সুপারিশ থাকছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে। কমিশন ইতোমধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে। আজ ৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ৩ জানুয়ারি প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করব। সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকছে। তবে নির্বাচন পদ্ধতিসহ কিছু বিষয় সংবিধান সংস্কার কমিশনের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশের মধ্যে থাকতে পারে- তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরুদ্ধার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার পাশাপাশি সংস্কার কমিশন নির্বাচন কমিশনকে আরও ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ থাকতে পারে প্রতিবেদনে। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ আইনের সংশোধনী প্রস্তাব থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সার্চ কমিটিতে সংসদের বিরোধী দল এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় থাকছে। এ ছাড়া ইসির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার প্রস্তাব থাকছে। তফসিল ঘোষণার পরে যে কোনো পর্যায়ে নির্বাচন স্থগিত করার ক্ষমতা ইসির হাতে রাখতে আরপিও সংশোধন করার প্রস্তাব দিচ্ছে সংস্কার কমিটি। এ ছাড়া নির্বাচনি হলফনামা যাচাই করা বাধ্যতামূলক করা; বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব হলফনামায় দেওয়া; নির্বাচনি কিছু অপরাধের অভিযোগে এখন নির্বাচনের ছয় মাসের মধ্যে মামলা করার কথা আইনে বলা আছে। এখানে সংশোধনী প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনি অপরাধের জন্য নির্বাচন কমিশনারদের দায়বদ্ধ করার জন্য আরপিওতে বিধান যুক্ত করা; যাতে নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে থাকছে সংসদের নারী আসন ১০০টি করা; নারী আসনে সরাসির নির্বাচন; প্রবাসীদের বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার অনুমতি দেওয়া; নির্বাচন কমিশনাররা নির্বাচনি অনিয়মে জড়িত থাকলে তাদের কীভাবে জবাবদিহি করা যায় তা থাকছে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্কার কমিশনের একজন সদস্য বলেন, এ ধরনের মামলায় তদন্তের মাধ্যমে কমিশনারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনগত বিধানের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে।
গত ৩ অক্টোবর নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য ড. বদিউল আলম মজুমদারের নেতৃত্বে সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সুপারিশ তৈরির জন্য অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়, অনলাইনে দেওয়া নাগরিকদের মতামত এবং রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাবও নিয়েছে কমিশন। পাশাপাশি নিজেরা নির্বাচন সংক্রান্ত সব আইনকানুন বিশ্লেষণ করেছে। সূত্র জানিয়েছে, অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে বিদ্যমান নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে মতামত চেয়ে গত ২২ অক্টোবর বিজ্ঞপ্তি জারি করে সংস্কার কমিশন। সেই সময় ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আগ্রহী ব্যক্তিদের এই সংস্কার কাজের জন্য পরামর্শ, মতামত ও প্রস্তাবনা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। পরে ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত অনলাইনে মতামত দেওয়ার সময় বাড়িয়েছিল কমিশন। এরপরেও সংস্কার কমিশন বিভিন্ন বিভাগে গিয়ে গিয়ে স্টেকহোল্ডারদের মতামত নিয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, নাগরিকদের মতামত বিশ্লেষণ করে ১৫ থেকে ২০টি বিষয়ে বেশি মতামত পাওয়া গেছে। এর মধ্যে নির্বাচন পদ্ধতি; সংবিধান ও নির্বাচনি আইনি কাঠামো; প্রার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা; নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ক্ষমতা এবং সার্বিক বিষয়; ভোটের স্বচ্ছতা; নির্বাচনে সরকার, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা; দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ; সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন; ‘না’ ভোট চালু; রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি; প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগ; ইভিএম পদ্ধতি বাতিল; সংসদীয় আসন বৃদ্ধি করা; ভোটার তালিকা সংশোধন ও হালনাগাদ; প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয় সীমানা; মনোনয়ন-বাণিজ্য; নির্বাচন পর্যবেক্ষণ; ইসির কর্মকর্তাদের জবাবদিহি; গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মতামত দিয়েছেন নাগরিকরা। এ ছাড়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক পেজ ও ফেসবুক মেসেঞ্জারেও হাজার হাজার মতামত পেয়েছে কমিশন।
এর আগে এ বিষয়ে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, ৩০-৪০ হাজারের বেশি সুপারিশ পেয়েছে ইসি সংস্কার কমিশন। সংসদ নির্বাচনের অনিয়মে ডিসি-এসপিদের জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বলেন, ডিসি-এসপিরা নিজেরাই শিকার করেছেন তারা চাপে পড়ে নির্বাচনি অনিয়মে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
