দ্রুতই বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম চালু করবে ভারত: রিপোর্ট
অনলাইন ডেস্ক
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন কাটিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ভিসা কার্যক্রম পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে উভয় দেশ। গত কয়েক মাসের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এটিই হতে যাচ্ছে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্কের পথে প্রথম বড় অগ্রগতি। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য সব বিভাগে ভিসা প্রদান শুরু করেছে এবং ভারতও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তাদের কার্যক্রম ধাপে ধাপে পূর্ণ মাত্রায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
গত মাসে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ভারত সফর করেন। সেসময়ই ঢাকার পক্ষ থেকে ভিসা ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তোলা হয় বলে দাবি করে ভারতীয় গণমাধ্যম। বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশন এবং কলকাতা, আগরতলা, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের উপ-হাইকমিশনসহ সব ভিসা কেন্দ্র কার্যকর রয়েছে। বাংলাদেশের এই ইতিবাচক পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে ভারত থেকেও দ্রুত একই ধরনের সাড়া পাওয়ার আশা করছে ঢাকা। গত ডিসেম্বরে সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকেই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতীয়দের জন্য ভিসা পরিষেবা পুনরায় শুরু করা হয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ঢাকা সফর করেন। সেই প্রতিনিধি দলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরিও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যা দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি বড় ইঙ্গিত।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সম্পর্কের যে শীতলতা তৈরি হয়েছিল, নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সেই জড়তা কাটিয়ে উঠতে চায় ভারত।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের মধ্যে ভিসা প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার পর পরবর্তী ধাপে অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং জ্বালানি সংযোগের মতো কৌশলগত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারত বাংলাদেশে ডিজেল রপ্তানি শুরু করেছে, যা বন্ধুত্বের একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও পর্দার আড়ালে আলাপ-আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
নয়াদিল্লির সরকারি সূত্রের তথ্যমতে, গত বছর নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভিসা প্রদানের হার মারাত্মকভাবে কমে গেলেও তা একেবারে বন্ধ হয়নি। বিশেষ করে চিকিৎসা সংক্রান্ত জরুরি প্রয়োজন বা পারিবারিক সংকটের মতো বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে সীমিত পরিসরে ভিসা কার্যক্রম চালু রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ভারতের পক্ষ থেকে এই সেবার হার প্রাক-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যায়ে রয়েছে, যা দ্রুত বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে চিকিৎসা ও পারিবারিক ভিসার অপেক্ষমাণ তালিকা ছোট করাই এখন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশে নিযুক্ত হতে যাওয়া নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব গ্রহণের পর এই ভিসা প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই মাসে বাংলাদেশ হাইকমিশন প্রায় ১৩ হাজার ভারতীয় নাগরিককে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভিসা প্রদান করেছে। এর মধ্যে ব্যবসা, পর্যটন ও চিকিৎসার জন্য ভ্রমণের হার যেমন রয়েছে, তেমনি একটি বড় অংশ রয়েছে যারা সীমান্ত পেরিয়ে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছুক। বিশেষ করে দিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের কেন্দ্রগুলো থেকে ব্যবসায়িক ভিসার আবেদন সবচেয়ে বেশি আসছে।
পর্যটন খাতের তথ্যানুসারে, ভারতের বিদেশি পর্যটকদের ২০ শতাংশের বেশি আসে বাংলাদেশ থেকে। তবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভিসা জটিলতার কারণে এই সংখ্যায় বড় ধরনের ধস নামে। ২০২৩ সালে যেখানে প্রায় ২১ লাখের বেশি বাংলাদেশি ভারত সফর করেছিলেন, ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র পৌনে পাঁচ লাখে।
মূলত চট্টগ্রাম ও সিলেটে ভারতীয় মিশনের সামনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর ভিসা অ্যাপয়েন্টমেন্টের সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছিল পর্যটন ও চিকিৎসাসেবার ওপর।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
