‘নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে’

বাসস

সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সাম্য, মানবতা ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আদর্শ নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহের কবি নন, তিনি সাম্য, সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারেরও কবি। তাঁর সাহিত্য ও সংগীত বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে। নজরুলের জীবনদর্শন ও সৃষ্টিকর্ম যথাযথভাবে চর্চার মাধ্যমে সমাজে মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মিলনায়তনে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

‘আবর্তনের নিবেদন : চিরদিনের নজরুল’ শীর্ষক এ আয়োজনে নজরুলের সাহিত্য, সংগীত, জীবনদর্শন ও বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁর অবদান নিয়ে আলোচনা করা হয়। অনুষ্ঠানে কবির সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তাঁর মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শন তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা, গান ও অন্যান্য সাহিত্যকর্মে মানুষের মুক্তি, অধিকার এবং মর্যাদার কথা বারবার উঠে এসেছে। অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আজও সমান প্রাসঙ্গিক। সমাজে যখনই বিভেদ, অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্য দেখা দেয়, তখন নজরুলের সাহিত্য মানুষকে ঐক্য ও সম্প্রীতির পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

তিনি বলেন, নজরুলের সৃষ্টিকর্ম কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রজন্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের আবেদন সর্বকালীন। নতুন প্রজন্মকে নজরুলের রচনা পড়তে, তাঁর গান শুনতে এবং তাঁর জীবনসংগ্রাম সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে নজরুলচর্চা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নিতে হবে।

সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণে তাঁর সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে জাতীয় সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিকর্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, নজরুল তাঁর লেখনী ও সংগীতের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নজরুলের এই দর্শনকে কেবল আলোচনা সভা কিংবা আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দৈনন্দিন জীবনেও ধারণ করতে হবে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, নজরুলের সাহিত্যকর্মের যথাযথ সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর অপ্রচলিত গান, কবিতা ও অন্যান্য রচনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সহজলভ্য করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে নজরুলের সৃষ্টিকর্ম দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব সংগঠন নিয়মিত আলোচনা সভা, সংগীতানুষ্ঠান, আবৃত্তি ও গবেষণামূলক আয়োজনের মাধ্যমে জাতীয় কবির জীবন ও কর্ম সম্পর্কে মানুষের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মের মধ্যে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগ তৈরিতেও সহায়ক হবে।

অনুষ্ঠানে বক্তারা কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও সংগীতের বহুমাত্রিকতা তুলে ধরে বলেন, তাঁর রচনায় একদিকে যেমন প্রতিবাদ ও মুক্তির আকাক্সক্ষা রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানবিক অনুভূতির গভীর প্রকাশ। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের বিকাশে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

আলোচনা সভা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নজরুলসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও অন্যান্য পরিবেশনার মধ্য দিয়ে জাতীয় কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান জাতীয় কবির সাহিত্য ও সংগীতের ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া এবং তাঁর আদর্শকে সমকালীন সমাজে প্রাসঙ্গিক করে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা আয়োজকদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights