নতুন জীবনে ৫৪ চরমপন্থি
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
কয়েক বছর আগের কথা। তাদের নামে ছিল হত্যা, অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে মামলা। দিনের পর দিন কেটেছে আত্মগোপনে। কেউ কেউ কাটিয়েছেন দীর্ঘ কারাজীবন। এখন সেসব মানুষের আত্মপরিচয় বদলে গেছে। কেউ মাছ চাষি, কেউ গরুর খামারি, কেউ আবার কৃষক। আত্মসমর্পণের পর রাজশাহীর ৫৪ জন সাবেক চরমপন্থির এই বদলে যাওয়া জীবনের গল্পের নাম ‘রাজশাহী স্বপ্নচাষ সমন্বিত কৃষি সমবায় সমিতি লিমিটেড।’ পাবনায় ২০১৯ সালে রাজশাহীসহ দেশের ১৪টি জেলার কয়েক শ বাম চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করেন। বিভিন্ন চরমপন্থি সংগঠনের সদস্যরা তাদের কাছে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র প্রশাসনের কাছে জমা দেন। আর এ আত্মসমর্পণই ছিল একটি নতুন জীবনের সূচনা। দেশের উত্তরাঞ্চলের চরম বামপন্থি আন্দোলনের ইতিহাস অর্ধশতাব্দীরও বেশি। সময়ের ব্যবধানে আদর্শিক আন্দোলনের বড় একটি অংশ সশস্ত্র সংঘাত, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও সহিংসতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। ফলে অসংখ্য প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। আর আত্মগোপনের জীবন হয়ে ওঠে অনেকের নিয়তি। পরে সরকারের পুনর্বাসন উদ্যোগ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি অনেক চরমপন্থি সদস্যকে সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে কর্মময় জীবনের পথে ফিরে আসতে উৎসাহিত করে।
এই আত্মসমর্পণ কর্মসূচির পেছনে রাজশাহী অঞ্চলের সদস্যদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আবদুর রাজ্জাক সরকার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক এই শিক্ষার্থী জানান, চরমপন্থি সদস্যদের আত্মসমর্পণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল তাদের কর্মসংস্থান। কারণ অস্ত্র জমা দেওয়ার পর জীবিকা নিশ্চিত না হলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা কঠিন-সেই বাস্তবতা থেকেই রাজশাহীর আত্মসমর্পণকারী ৫৪ জন সাবেক চরমপন্থি সদস্যকে নিয়ে ‘স্বপ্ন দেখি-স্বপ্ন জয়ের’ স্লোগানকে সামনে রেখে গড়ে তোলা হয় ‘রাজশাহী স্বপ্নচাষ সমন্বিত কৃষি সমবায় সমিতি লিমিটেড।’
সমিতির বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজীউর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক সরকার। তাদের নেতৃত্বে আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কৃষিভিত্তিক নানাবিধ সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আত্মসমর্পণকারী রাজশাহীর সদস্যদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারিভাবে ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে এই প্রকল্পের আওতায় রাজশাহীতে দুটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়। প্রথম খামার প্রকল্পটি বাগমারা উপজেলার বনগ্রামে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেখানে ১৩ বিঘা জমি কিনে পুকুর খনন, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন এবং বনজ, ফলদ ও ঔষধি বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে একটি সমন্বিত কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়েছে। দ্বিতীয় খামার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়েছে তানোর উপজেলায়। সেখানেও মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন এবং কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে আত্মসমর্পণকারী সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে রাজনীতিতে এসে বিপথগামী হয়েছিলাম। সেই পথ মানুষের কল্যাণ বয়ে আনেনি। কিন্তু আমরা স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন জয় করার জন্য। আমাদের বিশ্বাস, উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান ও সামাজিক সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির মাধ্যমেই সমাজকে পরিবর্তন করা সম্ভব। সমিতির কোষাধ্যক্ষ নওশাদ বলেন, ‘জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় পেছনে ফেলে এসেছি। আমরা এখন কায়িক পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের জন্য নতুন ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধ। সমাজ ও সরকার আমাদের সুযোগ দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো, সেই আস্থার প্রতি সম্মান জানানো। সমিতির বর্তমান সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গাজীউর রহমান বলেন, ‘একসময় আমাদের হাতে অস্ত্র ছিল। ছিল ত্রাসের আতঙ্ক। কিন্তু সেখানে এখন কৃষিকাজের ব্যস্ততা। আত্মগোপনে থাকা সদস্যদের সন্তানরা এখন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে। পরিবারগুলো ফিরে পেয়েছে স্বাভাবিক-সামাজিক জীবন। এই পরিবর্তন শুধু ৫৪ জন মানুষের জন্য নয়, পুরো এলাকার জন্যই একটি ইতিবাচক বার্তা।’
