নতুন সেতু দিয়ে চীন সফরে কিম, জোরালো হচ্ছে সম্পর্ক
অনলাইন ডেস্ক
উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন নতুন চালু হওয়া সেতু দিয়ে চীনের সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে পৌঁছেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে শনিবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপি।
দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের প্রেক্ষাপটে কিমের এ সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সংযোগ স্থাপনকারী নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ আনুষ্ঠানিকভাবে চালুর প্রায় এক সপ্তাহ পর কিমের এ সফর হলো।
সেতুটি নির্মাণ শেষ হয়েছিল ১২ বছর আগে, ২০১৪ সালে। তবে সংযোগ সড়ক ও শুল্ক অবকাঠামোর অভাবে এত দিন এটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে দক্ষিণ কোরিয়ার এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং সীমান্তবর্তী শহর দানদংয়ে কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তবে এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার বার্তা সংস্থা ইয়োনহাপও এক সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে কিমের চীন সফরের খবর প্রকাশ করেছে।
কিমের এ সফর এমন এক সময়ে হলো, যখন ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরীয় যুদ্ধে চীনের অংশগ্রহণের বার্ষিকী সামনে। ১৯৫০ সালের ২৫ অক্টোবর চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করছে পিয়ংইয়ং।
চীন-উত্তর কোরিয়া বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা
ইয়ালু নদীর ওপর নির্মিত প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ দুই দেশের সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চার লেনের এই সেতু দিয়ে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা উভয়মুখী যান চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে কনটেইনারবাহী যান ও ভারী পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করতে পারবে।
সেতুটি ২০১৪ সালে নির্মাণ শেষ হলেও উত্তর কোরিয়ার অংশে সংযোগ সড়ক ও শুল্কসংক্রান্ত অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকায় চালু করতে দীর্ঘ বিলম্ব হয় বলে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
চীনের শেনইয়াংভিত্তিক সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লিয়াওনিং একাডেমি অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ লু ছাও রয়টার্সকে বলেন, সেতুটি চালু হওয়ায় দুই দেশের বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা দূর হয়েছে।
তার মতে, পরিবহনব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতা কমে যাওয়ায় চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আরও বাড়তে পারে।
চীন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির অর্থনীতি, কূটনীতি ও রাজনৈতিক অবস্থান টিকিয়ে রাখতেও বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার জন্য চীনের এই সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, কিম জং উনের চীন সফর তার ক্রমবর্ধমান সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতির অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলে একটি সম্মিলিত অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন তিনি। কিমের দৃষ্টিতে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমেই নতুন এক ‘শীতল যুদ্ধের’ দিকে এগোচ্ছে।
কোরীয় যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পক্ষে লড়েছিল চীন। এরপর থেকে দেশটি পিয়ংইয়ংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। তবে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর মস্কোর সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাশিয়ার সঙ্গে এই ঘনিষ্ঠতা উত্তর কোরিয়ার চীনের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়েছে। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি মস্কোর সঙ্গেও কৌশলগত সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে পিয়ংইয়ং।
চীন-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি
কিম জং উনের সর্বশেষ জানা চীন সফর ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে। সে সময় বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ও চীনের বিজয়ের ৮০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকও করেন উত্তর কোরীয় নেতা।
এর আগে জুনে শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফর করেন। সে সময় তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, কৃষি, নির্মাণ ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে বেইজিংয়ের আগ্রহের কথা জানান। জবাবে কিম চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে উত্তর কোরিয়ার অন্যতম প্রধান কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বর্ণনা করেন।
নতুন সেতু চালু হওয়া এবং কিমের সফর- দুই ঘটনাই চীন ও উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরছে। সেতুটির মাধ্যমে বাণিজ্য বাড়লে উত্তর কোরিয়া অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা সুবিধা পেতে পারে, আর চীনও প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রভাব আরও সুসংহত করার সুযোগ পাবে। তবে এই ঘনিষ্ঠতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের ওপর। সূত্র: আল-জাজিরা
