নেপালে মর্গে জায়গা নেই, ডিএনএ নমুনায় চলছে স্বজনদের খোঁজ
অনলাইন ডেস্ক
এক সপ্তাহ আগের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর নেপালে এখন চারদিকে শুধু কান্না আর হাহাকার। উপচে পড়া মর্গে লাশের ভিড় সামলাতে না পেরে কর্তৃপক্ষ শত শত মরদেহ সমাহিত করতে বাধ্য হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিখোঁজ ও নিহত হাজার হাজার মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করতে রক্তের নমুনা সংগ্রহের দিকে জোর দিয়েছে প্রশাসন। ১৯ বছর বয়সী তরুণী প্রাকৃতিক গুরুং মঙ্গলবার সকালে হাসপাতালের পেছনের একটি কক্ষে গিয়ে এক শিশি রক্ত দিয়েছেন। তার আশা, রক্তের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে হয়তো নিখোঁজ মায়ের সন্ধান মিলবে। গুরুংয়ের বাবার মরদেহ ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে; হাসপাতালের বাইরে টানানো ছবির তালিকা দেখে তার ভাই বাবাকে শনাক্ত করেন।
সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মঙ্গলবার সকাল থেকেই হাসপাতালের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছেন শত শত স্বজন। সেনা কর্মকর্তা রমেশওয়ার অধিকারী জানান, সরকার নিখোঁজদের স্বজনদের রক্ত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। কেবল স্থানীয়রাই নন, বিদেশে থাকা স্বজনদের ডিএনএ প্রোফাইল পাঠানোর আকুতি জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার কয়েকজন নাগরিকসহ প্রথম দিনেই ৩৭ জন নমুনা দিয়েছেন এবং দিনে দিনে এই সংখ্যা কেবল বাড়ছে। অধিকারী বলেন, আমরা এখানে তাদের ভাইবোন বা প্রত্যক্ষ স্বজনদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করছি। পুরো উপত্যকা এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রক্ত দিতে আসছে। পুরো পরিস্থিতিকে একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি।
রাজধানী কাঠমান্ডুর এক বৌদ্ধ মঠের বাইরে দাঁড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন ৫৩ বছর বয়সী লাকপা ঘা। তিনি জানান, বন্যা তার পুরো পরিবারকে কেড়ে নিয়েছে। তার বাবা, ভগ্নিপতি, ছেলে, ছেলের বউ, চার বছরের নাতনি, মেয়ে এবং বোনের ভাই; এই সাতজনের সবাই পানিতে ভেসে গেছেন। ঘা এবং তার স্বামী সেই সময় কাঠমান্ডুতে থাকায় বেঁচে যান, কারণ তারা তাদের অন্য দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে সেখানে পড়াশোনার কাজে ছিলেন। তিনি আকুল হয়ে বলেন, আমি আমার পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। আমরা আমাদের সব হারিয়ে ফেলেছি।
মঠটিতে বর্তমানে প্রায় দুইশো দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তারা চোখের সামনেই ঘরবাড়ি মাটির সাথে মিশে যেতে এবং আপনজনদের ভেসে যেতে দেখেছেন। ঘা ক্ষোভের সাথে জানান যে, তার ছেলে ও মেয়ে তিমুরে গ্রামে ডাক্তার হিসেবে থেকে গিয়ে পুরো পরিবারের দেখভাল করছিলেন। দুর্গমতার অজুহাতে সেনাবাহিনী সেখানে উদ্ধারকাজ চালাতে পারছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশটির দূর উত্তরের ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্ত এলাকাগুলোতে পৌঁছাতে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। বন্যার তোড়ে পাহাড়ি অঞ্চলের মূল রাস্তা ও ব্রিজগুলো ভেসে যাওয়ায় রসুলার মতো দুর্গম অঞ্চলে সেনা কিংবা ত্রাণ সংস্থাগুলোর যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের কর্মী অ্যামি সাগিট্টা লেফেভ্রে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে ঠিকই, তবে তা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। উদ্ধারকারীদের জন্য যেটা চ্যালেঞ্জের, ত্রাণ সংস্থাগুলোর জন্যও সেটা একই রকম সমস্যা তৈরি করছে।
সংস্থাটি থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রিপল, কম্বল, বালতি, তাবু এবং নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় ডিগনিটি কিট সরবরাহ করা হচ্ছে।
দুর্গত এলাকায় প্রায় ২৬শ’ শিশু চরম অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ১০০ জনেরও বেশি শিশু মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লেফেভ্রে সতর্ক করে জানান যে, এই দীর্ঘমেয়াদি দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে শিশু পাচার নিয়ে। ঐতিহাসিকভাবে নেপালের এই অঞ্চলটি নারী ও শিশু পাচারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ফলে বর্তমানে এলোমেলো পরিস্থিতির সুযোগে গৃহহীন ও এতিম শিশুরা যাতে পাচারকারীদের খপ্পরে না পড়ে, সে বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। আপাতত ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট এবং ত্রাণসহায়তার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন হাজারো স্বজনহারা মানুষ।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
