নোবেলজয়ী অ্যান কারসন : ধ্রুপদি ঐতিহ্যের জমিনে নতুন সাহিত্যরূপের স্রষ্টা

শাহাবুদ্দীন নাগরী
অ্যান কারসনের লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তিনি নিজের দুঃখকে সরাসরি আবেগের ভাষায় প্রকাশ না করে বুদ্ধি, সাহিত্য ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে দেখান। ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়

অ্যান প্যাট্রিসিয়া কারসন (জন্ম ২১ জুন, ১৯৫০), যিনি অ্যান কারসন নামে সমধিক পরিচিত, একজন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, ধ্রুপদি সাহিত্যের পণ্ডিত এবং অধ্যাপক।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভের পর কারসন ১৯৭৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে- ধ্রুপদি সাহিত্য, তুলনামূলক সাহিত্য এবং সৃজনশীল লেখালেখি বিষয়ে পাঠদান করেছেন। যার মধ্যে রয়েছে ম্যাকগিল, মিশিগান, নিউইয়র্ক এবং প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়-

এ পর্যন্ত তাঁর লেখা ও অনুবাদের অন্তত ২৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কারসন গুগেনহেইম ও ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ লাভ করেছেন এবং ল্যানান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড, দুটি গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ, টি এস এলিয়ট প্রাইজ, প্রিন্সেস অফ আস্তুরিয়াস অ্যাওয়ার্ড, ইংরেজি কবিতার জন্য গভর্নর জেনারেলস অ্যাওয়ার্ড ও পেন/নাবোকভ অ্যাওয়ার্ড জয় করেছেন। কানাডীয় সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০০৫ সালে তাঁকে ‘অর্ডার অফ কানাডা’র সদস্য হিসেবে ভূষিত করা হয়।

২০২৬ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কারের যথার্থতা ও যুক্তি হিসেবে সুইডিশ নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে, তাঁর সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্ম যা ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে এক কৌতুকপূর্ণ ও সৃজনশীল কথোপকথনের মাধ্যমে আধুনিক সৃজনশীল ও মননশীল এবং সমসাময়িক সাহিত্যের জন্য নতুন রূপ ও প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে। কারসনের বেশির ভাগ কাজই ভাষার প্রতি তাঁর কাব্যিক মুগ্ধতা থেকে জন্ম নিয়েছে। সুইডিশ একাডেমি উল্লেখ করেছে, ‘তার প্রায় সাহিত্যকর্মই কেন্দ্রীভূত হয়েছে শব্দের প্রতি ভাষাতাত্ত্বিকের আবেশ এবং নতুন অর্থের প্রতি কবির আকাক্সক্ষার ছেদবিন্দুতে’, এবং আরও যোগ করেছে যে কারসন ‘শব্দের ব্যুৎ্পত্তিকে চিহ্নিত করেছেন তাঁর সমস্ত কাজের সূচনাবিন্দু’ হিসেবে।

৮ অক্টোবর ২০২৬ সকালে যখন নোবেল কমিটি সাহিত্যে তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির কথা ঘোষণা করছিলেন অ্যান কারসন তখন ছিলেন আইসল্যান্ডের রাজধানী রেইকিয়াভিকে নিজ বাড়িতে। ২০২২ সালে অ্যান কারসন এবং তাঁর স্বামী শিল্পী রবার্ট কুরি আইসল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার ঠিক পরের সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি তখন রান্নাঘরের মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছিলেন। মেঝেটা পরিষ্কার করা দরকার মনে হওয়ায় তিনি ঝাড়ু হাতে মনোযোগ দিয়ে কাজ করছিলেন। এর মধ্যেই সুইডিশ অ্যাকাডেমি থেকে বারবার ফোন আসতে থাকে। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কারসন সাধারণত অচেনা নম্বর থেকে ফোন বেজে উঠলে ফোন রিসিভ না করে বন্ধ করে দেন। বার বার ফোন বাজতে থাকায় তাঁর স্বামী ফোনটি ধরেন এবং তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে ফোনটি রিসিভ করতে বলেন। ফলে শেষ পর্যন্ত নোবেল কমিটির সঙ্গে তাঁর কথা হয়।

সুইডিশ অ্যাকাডেমির স্থায়ী সচিব, লেখক ও সাংবাদিক ইনগ্রিড কার্লবার্গ বলেন, খবরটি তাঁর কাছ থেকে শুনে অভিভূত হয়ে কারসন দীর্ঘ আবেগপূর্ণ বক্তৃতা দেননি, বরং তাঁর স্বভাবসুলভ রসিকতা ও বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। তিনি খুবই বিস্মিত হয়েছিলেন এবং ফোনে তাঁদের কথাও খুব সংক্ষিপ্ত হয়েছিল। কারসন তখন শুধু বলেছিলেন, তিনি আইসল্যান্ডে আছেন এবং বাতাসের শব্দ শুনছেন।

নোবেল পুরস্কারের সাহিত্যবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও লেখক অ্যান্ডার্স ওলসন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কারসন আখ্যান-নির্ভর আত্মায় আবদ্ধ গীতিকবিতা থেকে বেরিয়ে এসে সমসাময়িক সাহিত্যের নতুন রূপকে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর লেখার এই পদ্ধতি এমন সব কৌতুকপূর্ণ ও শ্লেষাত্মক রচনার জন্ম দেয়, যা কেবল ধ্রুপদি ও আধুনিক কবিতার মধ্যেই নয়, বরং বিভিন্ন ধারা ও শিল্পমাধ্যমের মধ্যেও বিচরণ করে।’

নোবেলপ্রাপ্তির খবরটি জানার পর তাঁর অনুভূতি কেমন ছিল? আইসল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম আরইউভি তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি কারসনসুলভ ভঙ্গিতে বলেন, ‘Crazy. I think they’re all crazy’, অর্থাৎ ‘পাগল! আমার মনে হয় ওরা সবাই পাগল।’ আর নোবেল পাওয়ার ফলে তাঁর বইয়ের কী হবে-এমন প্রশ্নে তিনি মজা করে বলেছিলেন, ‘বইয়ের সামনে নোবেলজয়ী হওয়ার একটা স্টিকার লাগবে।’

তখন আইসল্যান্ডে কয়টা বাজে?

নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের ঘোষণা স্টকহোমে গ্রিনিচ মান সময় দুপুর ১টায় হয়েছিল। প্রকাশিত সময় অনুযায়ী রাজধানী রেইকিয়াভিকে তখন সকাল ১১টা। আরইউভি-এর সাক্ষাৎকার-প্রতিবেদনটি আইসল্যান্ডের সময়ে দুপুর ১২.৩৯ মিনিটে প্রচারিত হয় এবং রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, সাংবাদিক গ্রেটা সিগ্রিদুর আইনর্সদোত্তির পুরস্কারের খবর পাওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরেই তাঁর বাড়ির বাইরে কারসনের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাক্ষাৎকারটি নেন। নিঃসন্দেহে সাহিত্যে নোবেল ঘোষণার ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অ্যান কারসনসুলভ মুহূর্তগুলোর একটি তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির খবর।

অ্যান কারসনের কবিতা, প্রবন্ধ ও আখ্যানমূলক বইগুলোর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হলো ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ (১৯৮৬), ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ (১৯৯৫), ‘প্লেইনওয়াটার: এসেজ অ্যান্ড পোয়েট্রি’ (১৯৯৫), ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ (১৯৯৮), ‘ইকোনমি অফ দ্য আনলস’ (১৯৯৯), ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজবেন্ড’ (২০০১), ‘দ্য মিরর অফ সিম্পল সোলস অ্যান অপেরা ইনস্টলেশন’ (২০০৩), ‘ডিক্রিয়েশন পোয়েট্রি, এসেজ, অপেরা’ (২০০৫), ‘নক্স’ (২০১০), ‘নর্মা জিন বেকার অফ ট্রয়’ (২০১৯), ‘দ্য ট্রোজান উইমেন: আ কমিক’ (২০২১), ‘দ্য জেন্ডার অব সাউন্ড’ (২০২৫) ইত্যাদি। তাঁর অনূদিত ও সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সফোক্লিস ইলেকট্রা’ (২০০১), ‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অফ স্যাফো’ (২০০২), ‘গ্রিফ লেসনস: ফোর প্লেজ বাই ইউরিপিডিস’ (২০০৬), ‘অ্যান ওরেস্টিয়া’ (২০০৯), ‘ইউরিপিডিস, ইফিজেনিয়া অ্যামং দ্য টরিয়ানস’ (২০১৪), ‘অ্যান্টিগোনে’ (২০১৫), ‘বাখাই’ (২০১৫) ইত্যাদি।

অ্যান কারসনের ‘সবচেয়ে বিখ্যাত’ একটি বই নির্দিষ্ট করা কঠিন। কারণ তিনি একই সঙ্গে কবি, প্রাবন্ধিক ও ধ্রুপদি সাহিত্য-বিশারদ। তবে সমালোচক ও পাঠকদের কাছে তাঁর সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী বই হিসেবে ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ (১৯৯৮)-এর নামটি আগে আসে। এটি একটি অভিনব কাব্য-উপন্যাস। এই কাব্য-উপন্যাসে অ্যান কারসন প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের একটি খণ্ডিত পুরাণকে আধুনিক রূপে ফিরিয়ে এনেছেন। বইটির প্রধান চরিত্র গেরিয়ন, যে এক লাল-ডানাওয়ালা কিশোর, সে প্রেম, একাকিত্ব, আত্মপরিচয় ও বেদনার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। এই বইয়ের বিশেষত্ব হলো-কবিতা, উপন্যাস ও পুরাণের মিশ্রণ, আধুনিক জীবনের সঙ্গে প্রাচীন গ্রিক কাহিনির সংযোগ, প্রেম ও বিচ্ছেদের সূক্ষ্ম ও গভীর অনুভূতির প্রকাশ এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ চিত্রময় ভাষা। অনেক আলোচকের মতে, এই বইটি অ্যান কারসনের কল্পনাশক্তি ও ভাষার সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

২০১১ সালে ব্রিটিশ কবি রুথ প্যাডেল (জ. ১৯৪৬) দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় অ্যান কারসনের ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ বইটি পড়ে তাঁর মুগ্ধতা নিয়ে লিখেছিলেন:

‘আমি প্রথম কানাডিয়ান কবি অ্যান কারসনকে মুগ্ধতার চোখে দেখি একজন গ্রিক পণ্ডিত হিসেবে, যখন আমিও সেই একই পেশায় জীবিকা নির্বাহ করছিলাম। আমি তার কবিতায় শব্দ ও ভাবনার প্রতি সেই একই অনুপ্রেরণাদায়ী আবেগ খুঁজে পেয়েছিলাম।’ ‘৫২ ওয়েজ অফ লুকিং অ্যাট আ পোয়েম’ বইতে আমি তাঁর একটি কবিতা নিয়ে লিখেছিলাম, যেখানে এক মেয়ে তার বিরক্তিকর মায়ের সঙ্গে নাশতা করে, তারপর তার বাবাকে দেখতে যায়, যিনি আলঝেইমার রোগী। আপনি ভাবতেও পারবেন না যে এ বিষয় থেকে কেউ একটি মর্মস্পর্শী গীতিকবিতা বানাতে পারে। কিন্তু তিনি পারেন। তাঁর ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড’ আমার মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আমি বুঝতে পারলাম, আপনি যদি যথেষ্ট সততার সঙ্গে নিজের কল্পনাকে অনুসরণ করেন, তবে কবিতা দিয়ে আপনি একেবারে যে কোনো কিছুই করতে পারেন। তিনি হেরাক্লিসের ডানাওয়ালা লাল দানব গেরিয়নকে পরাজিত করার পৌরাণিক কাহিনিকে একটি প্রেমের গল্পে পরিণত করেছেন। এমিলি ডিকিনসনের মতো কারসন জাঁকজমকপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করেন না। তাঁর নিরাসক্ত, বাস্তবানুগ স্বর, এবং মানব অভিজ্ঞতাকে যতটা সম্ভব তীব্রভাবে তুলে ধরে এমন শব্দ খোঁজার যে সাধনা, তা গভীর উপলব্ধিতে ব্যথাতুর হয়ে ওঠে। তাঁর মৌলিকত্বের একটা অংশ হলো, তিনি মৌলিক হওয়ার চেষ্টা করেন না। তিনি এমন কিছু বানানোকে মোটেই আকর্ষণীয় মনে করবেন না, যা একেবারে নতুন নয়।’

‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজবেন্ড’ বইটি একটি ভাঙা বিবাহের গল্প, যা ২৯টি ট্যাঙ্গো বা অংশে বলা হয়েছে। প্রেম, সৌন্দর্য, সত্য ও প্রতারণার সম্পর্ককে অ্যান কারসন অত্যন্ত কাব্যিক ভাষায় অনুসন্ধান করেছেন এই গ্রন্থে। আলোচকদের মতে, এই বইটি প্রেমের কবিতা না, একটা ভাঙা বিয়ের অ্যানাটমি। অ্যান কারসনের প্রথম বিয়েটা হয় ১৯৭২ সালে এবং সেটা ভেঙে যায় ১৯৮০ সালে। হতে পারে নিজের বৈবাহিক জীবনের বিষয়াদি নিয়ে ব্যবচ্ছেদ করেছেন এই ২৯টি ট্যাঙ্গো’তে। ট্যাঙ্গো এক ধরনের নাচ এবং সেই নাচের জন্য বাজানো আবেগী-সংগীত, যা জীবনকে নাচায় বা হতে পারে একটি প্রবাদ বাক্য, যার বাংলা ভাবার্থ হলো এক হাতে তালি বাজে না। অর্থাৎ কোনো ঘটনা গড়ার জন্য দুপক্ষই দায়ী। তিনি নিজেই বলেছেন, ট্যাঙ্গো আর বিয়ে দুটোই এমন জিনিস যা একবার শুরু করলে শেষ পর্যন্ত নাচতে হয়। তিনি প্রতিটা ট্যাঙ্গো শুরু করেছেন জন কিটসের একটা উক্তি দিয়ে। ভিতরে লম্বা লাইন আর খুব ছোট লাইনের অল্টারনেশন আছে, যেটা ট্যাঙ্গো নৃত্যশিল্পীদের পা ফেলার মতো লাগে। আর ২৯টা ট্যাঙ্গোর পর একটা ৩০তম এন্ট্রি আছে, যেটা স্বামীর লেখা। তিনি বলেছেন, এটা ঠিক কবিতাও না, প্রবন্ধও না, এটি মানে কল্পিত প্রবন্ধ।

কারসন বইটি কবি কিটসকে উৎসর্গ করেছেন, উৎসর্গপত্রে লিখেছেন, ‘For his general surrender to beauty. কারসন এই বইয়ের জন্যই প্রথম নারী হিসেবে টি এস এলিয়ট পুরস্কার জিতেন, সঙ্গে পান এল এ (লস অ্যাঞ্জেলেস) টাইমস বুক প্রাইজ এবং কিউডব্লিউএফ অ্যাওয়ার্ড।

অ্যান কারসনের লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো- তিনি নিজের দুঃখকে সরাসরি আবেগের ভাষায় প্রকাশ না করে বুদ্ধি, সাহিত্য ও চিত্রকল্পের মাধ্যমে দেখান। ফলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর মানবিক অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। এ নিয়ে তাঁর একটি গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ডিক্রিয়েশন’। এখানে কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং নাট্যধর্মী রচনা একসঙ্গে আছে। বইটির একটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো- নিজেকে কীভাবে অতিক্রম করা যায়? ফরাসি ম্যাজিস্ট্রেট, রাজনীতিবিদ ও নাৎসি গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া সিমোন ভেইল (১৯২৭-২০১৭), যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদ ও নেতা মার্গারেট পোরা এবং প্রাচীন গ্রিকসাহিত্যের বিভিন্ন তথ্য ও উৎসকে কারসন নিজের ব্যক্তিগত ও দার্শনিক অনুসন্ধানের সঙ্গে মিলিয়ে দেন। প্রবন্ধধর্মী লেখা আসলে ‘কবিতা দিয়ে চিন্তা করা’ নয়। তিনি যুক্তি যেমন ব্যবহার করেন, তেমনি নীরবতা, স্মৃতি, পুরাণ ও চিত্রকল্পকেও চিন্তার উপকরণ বানান।

অ্যান কারসনের ‘গ্লাস, আয়রনি অ্যান্ড গড’ বইটি তাঁর ১৯৯৫ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। বইটিতে কবিতা, গদ্য, প্রবন্ধধর্মী লেখা-এসবের সীমা ইচ্ছাকৃতভাবে তুলে নিয়ে সব এক করে দিয়েছেন। বিশেষ করে এর প্রথম ও সবচেয়ে বিখ্যাত রচনাগুলোর একটি ‘দ্য গ্লাস এসে’, এতে তাঁর ব্যক্তিগত প্রেম-বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতা, মায়ের বাড়িতে ফিরে যাওয়া এবং ব্রিটিশ লেখক এমিলি ব্রন্টের (১৮১৮-১৮৪৮) সাহিত্য-এই তিনটি স্তর একসঙ্গে মিশে গেছে। তাই এটিকে শুধু কবিতা না বলে ‘লিরিক এসে’ বলা যায় এবং এ কারণেই তাঁকে ‘লিরিক এসে’-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধুনিক লেখক হিসেবেও দেখা হয়। এই বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো- কারসনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং এমিলি ব্রন্টের সাহিত্য একে অন্যের সঙ্গে কথোপকথন করতে থাকে। নিজের বিচ্ছেদের কথা বলতে গিয়ে তিনি ব্রন্টের বিখ্যাত নাট্যগ্রন্থ ‘উইদারিং হাইটস’ (১৮৪৭) বইটির দিকে তাকান, আবার ব্রন্টের চরিত্রদের দিকে তাকিয়ে নিজের জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন।

২০২৬-এর সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন এই বিচিত্র ও বহুধা চিন্তার আধুনিক কবি-লেখক অ্যান কারসন। যিনি বলছেন, কবিতা শুধু সৌন্দর্যের ভাষা নয়, কবিতা চিন্তারও একটি পদ্ধতি। তিনি প্রশ্ন করেন, আমরা কেন কাউকে ভালোবাসি? ভালোবাসার মানুষ চলে গেলে তার কী থাকে? স্মৃতি কি সত্যিই অতীতকে ধরে রাখে? অন্যের লেখা কি আমাদের নিজের জীবনকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে? বিচ্ছেদের পর ‘আমি’ কি আর আগের সেই মানুষটি থাকে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো সহজ উত্তর কারসন দেন না, বরং পাঠককে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে নিয়ে যান। তিনি কেন ক্রমাগত এক রূপ থেকে অন্য রূপে চলে যান, এমন প্রশ্নের জবাবে কারসন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-,

‘একঘেয়েমি, মনে হয়। একটা অস্থিরতা আছে। চেষ্টা করার মতো অনেক রূপ আছে।’ তাঁর লেখালেখির ভিতর দিয়ে তিনি প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছেন, অনেক অজানা রূপের সন্ধান করছেন তিনি। নোবেল পুরস্কার তাঁর চিন্তার পৃথিবীতে নতুন কী পরিবর্তনের সূচনা করে, তা দেখবার জন্য তাঁর নতুন প্রকাশনার দিকে মনোযোগ রাখতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights