পারস্য উপসাগরে সুপারট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া পাঁচ লাখ ডলার ছুঁয়েছে

অনলাইন ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে পাল্টাপাল্টি অবরোধের জেরে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তেলের ট্যাংকার সংকট দেখা দেওয়ায় ভিএলসিসি (অতি বৃহৎ) অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের দৈনিক ভাড়া বৃদ্ধি পেয়ে গড়ে পাঁচ লাখ ১০ হাজার মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

যুদ্ধাবস্থার মধ্যেও উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে অনেক জাহাজ মালিক জীবনের ঝুঁকি নিয়েই এই অঞ্চল থেকে চীনে তেল পরিবহনে রাজি হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীন রুটে অপরিশোধিত তেল পরিবহনের আয় বিগত কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সিনোকরের মালিকানাধীন ‘মঙ্গোলিয়া প্রসপারিটি’ নামের একটি ভিএলসিসি ট্যাংকার সম্প্রতি পারস্য উপসাগরের গোপন বন্দর থেকে পূর্ব এশিয়ায় তেল নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রায় ৩১ মিলিয়ন ডলারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে।

গত এপ্রিলে মার্কিন-ইসরায়েলি ও ইরানের যুদ্ধের পর যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়িত হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই চুক্তি কার্যকারিতা হারিয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে দুই পক্ষই নিজস্ব নৌ-অবরোধ জোরদার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে সামরিক সংঘাত তীব্র রূপ নিয়েছে এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর হামলা বাড়ছে।

বহুজাতিক সংস্থা জয়েন্ট মেরিটাইম ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্যমতে, প্রণালি অতিক্রম করার সময় ইরানি হামলায় সম্প্রতি অন্তত একজন নাবিক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে ওমান উপসাগরে ইরানি বন্দরের দিকে যেতে চাওয়া একটি পানামা পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজে মার্কিন সামরিক বাহিনী গুলি চালিয়েছে। যদিও ওয়াশিংটন দাবি করছে, প্রণালিটি এখনও উন্মুক্ত রয়েছে। গণমাধ্যমের খবরের চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এটি অতিক্রম করছে। বাস্তবে নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের জাহাজের প্রাপ্যতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে।

এই চরম অনিশ্চয়তা ও জ্বালানি পরিবহনের সংকট জাহাজ ব্যবসা খাতে অভাবনীয় মুনাফার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ক্রুড অয়েল ফ্রেইট ফিউচার্সে বিনিয়োগের বিশেষ ফান্ড ‘ব্রেকওয়েভ ট্যাংকার শিপিং ইটিএফ’-এর শেয়ারমূল্য চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার দুই শত শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রীষ্মকালীন সময়ে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি ঘটে চলায় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা হরমুজ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার পক্ষেই বাজি ধরছেন।

অপরদিকে, ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে পুনরায় জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করায় বাব আল-মানদেবে বিকল্প পথ ধরে চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতির মোকাবেলায় সৌদি আরব সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরে তেল পাঠাতে বাধ্য হচ্ছে, সেখান থেকে ভিএলসিসি ট্যাংকারে তেল নিয়ে আফ্রিকার কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ দীর্ঘ এই রুটের কারণে বাজারে খালি জাহাজের চরম সংকট তৈরি হয়ে পরিবহনের ভাড়া লাগামহীনভাবে বাড়াচ্ছে।

যুদ্ধের এই আবহেও সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অবস্থান ধরে রাখতে বাণিজ্যিক ঝুঁকি নেওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রতিবেদন অনুয়ায়ী, দেশটি সম্প্রতি দৈনিক রেকর্ড ৪১ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন করেছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই সংকটকালে বহু সংযুক্ত আরব আমিরাতের ট্যাংকার নিজেদের অবস্থান ট্র্যাকিংয়ের ট্রান্সপন্ডার সিগন্যাল বন্ধ রেখে গোপনে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছে।

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights