পারিবারিক কলহ কত ভয়ঙ্কর!

অনলাইন ডেস্ক

ঘটনাটি ভারতের। দেশটির উত্তরপ্রদেশের বেরেলি শহরের ইজ্জতনগর এলাকার একটি বাড়িতে এক যুবককে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ৩৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির নাম জিতেন্দ্র কুমার যাদব।

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দীর্ঘ নয় বছরে ধরে প্রেম করে বিয়ে করেন জিতেন্দ্র। কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই মাসের মধ্যেই লাশ হলেন তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে জানানো হয়। এর পরে বেরিয়ে আসতে থাকে লোমহর্ষক সব কাহিনী। প্রতিবেশীদেরও বলা হয়, জিতেন্দ্র আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্টে বেরিয়ে আসে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল ‘শ্বাসরোধ’। সব প্রমাণ একত্র করে পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্রকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন তার স্ত্রী জ্যোতি। আর সে সময় তার শ্বশুর, শাশুড়ি ও শ্যালক তাকে চেপে ধরে রাখে।

হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালাতে, একটি মাফলার দিয়ে মরদেহ জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জিতেন্দ্রর শ্যালকের খোঁজে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে।

পুলিশ জানায়, জ্যোতি ও জিতেন্দ্র কুমার যাদব গত বছরের ২৫ নভেম্বর বিয়ে করেন। তাদের প্রেমের সম্পর্কের বয়স ছিল প্রায় নয় বছর, যা শুরু হয়েছিল ছাত্রজীবনে। হিন্দু রীতি অনুযায়ী এবং দুই পরিবারের সম্মতিতেই বিয়েটি হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে মূলত অর্থ সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে।

পুলিশের অভিযোগ অনুযায়ী, জ্যোতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে ২০ হাজার রুপি তুলে অনলাইন জুয়ায় হারিয়ে ফেলেন জিতেন্দ্র। এই ক্ষতি থেকেই দাম্পত্য কলহ শুরু হয় এবং তা ক্রমেই তীব্র আকার নেয়।

২৬ জানুয়ারি জ্যোতি স্বামীর কাছে ওই রুপির হিসাব চাইলে দু’জনের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা হয়। যা একপর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয়। তখন জ্যোতি তার মা-বাবা ও ভাইকে ফোন করে ওই বাড়িতে ডেকে আনেন। এই দম্পতি বিয়ের পর থেকে ইজ্জতনগরের গির্জা শঙ্কর কলোনির ওই ভাড়া বাড়িতেই থাকতেন। জিতেন্দ্রের বাড়ি ছিল ইটাওয়া জেলার ভাবুপুরা গ্রামে।

পুলিশ জানায়, জ্যোতির বাবা কালিচরণ, মা চামেলি এবং ভাই দীপক ফোন পেয়ে ওই বাড়িতে যান। এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে পুলিশ দাবি করছে- বাবা, মা ও ভাই মিলে জিতেন্দ্রের হাত-পা চেপে ধরে রাখেন। সেই সুযোগে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। জিতেন্দ্র নিস্তেজ হয়ে পড়ার পর, হত্যার আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। পুলিশ বলছে, একটি মাফলার দিয়ে মরদেহ বেঁধে জানালা বা ভেন্টিলেটরের গ্রিলে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়, যেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে মনে হয়। এরপর প্রতিবেশীদের ডেকে বলা হয়, জিতেন্দ্র আত্মহত্যা করেছে।

২৬ জানুয়ারি পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বিষয়টি প্রথমে সন্দেহজনক আত্মহত্যা হিসেবেই দেখা হয়। ভাড়া বাড়ির ভেতরেই জিতেন্দ্রর ঝুলন্ত মরদেহ পাওয়া যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে আত্মহত্যার দাবি খণ্ডন করার মতো কিছু চোখে পড়েনি। তবে জিতেন্দ্রর ভাই অজয় কুমার পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ জ্যোতি ও আরও তিনজনের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা দায়ের করে এবং ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে স্পষ্ট হয় জিতেন্দ্রর মৃত্যু ঝুলে পড়ার কারণে নয়, শ্বাসরোধের কারণে হয়েছে। এর ফলে আত্মহত্যার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়।

এরপর পুলিশ মামলার ধারা পরিবর্তন করে হত্যা মামলা রুজু করে এবং তদন্ত জোরদার করে। জ্যোতির ভাই দীপককেও এই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা জ্যোতি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের জানান, ছাত্রজীবন থেকেই তার ও জিতেন্দ্রর পরিচয় ও সম্পর্ক ছিল।

পুলিশ জানায়, জিতেন্দ্র বেরেলিতে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ভেটেরিনারি রিসার্চ ইনস্টিটিউটে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জ্যোতি কাজ করতেন উত্তরপ্রদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনে চুক্তিভিত্তিক বাস কন্ডাক্টর হিসেবে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই আর্থিক বিষয় নিয়ে ঘনঘন ঝগড়া হচ্ছিল, যা সম্পর্ককে তিক্ত করে তোলে। ঘটনার দিন সেই ঝগড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তিনি পরিবারকে ফোন করেন।

পুলিশের অভিযোগ এরপর যে সংঘর্ষ হয়, তাতে তার মা-বাবা ও ভাই জিতেন্দ্রকে ধরে রাখেন এবং রাগের বশে জ্যোতি তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। সূত্র: ইন্ডিয়া ‍টুডে, এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights