পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে কর সার্টিফিকেটের বাধা দূর করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

অনলাইন ডেস্ক
দেশের মন্দাদশায় থাকা পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বড় এক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অনিবাসী (বিদেশি) বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে নিরীক্ষকের (অডিটর) সার্টিফিকেট বা সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা বাতিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বুধবার জারিকৃত নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনিবাসী বিনিয়োগকারী টাকা অ্যাকাউন্টের (এনআইটিএ) কর আদায় প্রক্রিয়াকে সহজ করেছে। এর ফলে শেয়ার বিক্রির অর্থ সাথে সাথে অ্যাকাউন্টে জমা (ক্রেডিট) হবে এবং ব্যাংকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কর কেটে রাখতে পারবে।

এর আগে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিটি শেয়ার লেনদেনের পর মূলধনী মুনাফা কর (ক্যাপিটাল গেইন্স ট্যাক্স) নির্ধারণের জন্য একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের কাছ থেকে সনদ নিতে হতো। এই সনদ পাওয়ার পরই কেবল সেই অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ বা বিদেশে পাঠানো যেত। এই প্রক্রিয়ার কারণে প্রায়শই দীর্ঘ বিলম্ব হতো, পরিপালন খরচ (কমপ্লায়েন্স কস্ট) বাড়ত এবং এটি সক্রিয় লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নতুন নিয়ম কীভাবে কাজ করবে
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলো এখন থেকে অনিবাসী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বা সিকিউরিটিজ বিক্রির অর্থ থেকে সরাসরি প্রযোজ্য মূলধনী মুনাফা কর কেটে বা আটকে রাখবে। এই অর্থ সরাসরি সংশ্লিষ্ট ‘এনআইটিএ’ অ্যাকাউন্টে জমা করা হবে, যা পরে বিদেশে পাঠানোর আগে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, আগের পদ্ধতি অনুযায়ী অনিবাসী বিনিয়োগকারীরা স্টক মার্কেটের শেয়ার কিনতেন এবং তা বিক্রি করে লাভ করতেন। শেয়ার বিক্রির পর লাভের ওপর ট্যাক্স কাটার পর বাকি টাকা তার অ্যাকাউন্টে জমা হত। অর্থাৎ, কর কর্তনের পর মুনাফা অ্যাকাউন্টে জমা হত। পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়েই অনেকে আপত্তি জানিয়েছিলেন, কারণ এটার জন্য প্রায় ১৫ দিনের মতো সময় লাগত। কর হিসাব করে সার্টিফিকেট নেওয়া থেকে নানা কার্যক্রমে অনেক সময় লাগত।”

তিনি বলেন, “এখন যে নিয়ম করা হয়েছে তা হলো—শেয়ার বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থ অ্যাকাউন্টে জমা করতে পারবে। তবে বাংলাদেশ থেকে বাইরে বা বিদেশে নেওয়ার সময় ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স ও শেয়ার বিক্রিতে কত লাভ করল – সেটা আলাদা রেখে বাকি টাকা প্রত্যাবাসন করতে পারবে। তাহলে অ্যাকাউন্টে সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট হয়ে যাবে। তখন উক্ত বিনিয়োগকারী চাইলে আবার শেয়ার কিনতে পারবে। কিন্তু অ্যাকাউন্টে জমা হতে ৩০ দিন সময় লাগলে— শেয়ারবাজারে পুনঃবিনিয়োগ করতে তার আরো বেশি সময় লাগবে। এখন পুনঃবিনিয়োগ করতে কম সময় লাগবে, তাতে দেশে বিদেশী বিনিয়োগ আনার জন্য উৎসাহ প্রদান করা হল।”

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক এই অনুমোদন দিয়েছে।

দীর্ঘদিনের বাধা দূর
সিটি ব্রোকারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মিসবাহ উদ্দিন আফান ইউসুফ গণমাধ্যমকে বলেন, এটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় বাধা ছিল।

ইউসুফ ব্যাখ্যা করে বলেন, “আগে ছোটখাটো লেনদেনের জন্যও ক্লায়েন্টদের ম্যানুয়ালি একটি সিএ (চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট) সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে কাস্টোডিয়ান ব্যাংকে জমা দিতে হতো। কেপিএমজি-র মতো বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এটি পরিচালনা করতে পারলেও, ছোট বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি ছিল একটি দুঃস্বপ্ন।”

তিনি আরও যোগ করেন, “এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত স্বাধীনভাবে লেনদেন করতে পারতেন না। এখন ব্যাংক নিজেই ১৫% মূলধনী মুনাফা কর গণনার বিষয়টি দেখবে এবং শুধুমাত্র বিদেশে অর্থ পাঠানোর সময় সার্টিফিকেট ইস্যু করবে। এটি একটি বিশাল স্বস্তি, যা নির্বিঘ্নে লেনদেনের সুযোগ করে দেবে।”

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলাম এই পদক্ষেপকে বাজারের জন্য একটি “মৌলিক পরিবর্তন” হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন।

তিনি বলেন, “মূলধনী মুনাফা কর চালুর পর থেকে ‘এনআইটিএ’ লেনদেন সহজ করার জন্য ডিএসই এবং ডিবিএ একাধিকবার কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে। অবশেষে এই সমস্যার সমাধান হলো। এটি বিদেশি পুঁজির অবাধ প্রবেশ ও প্রত্যাবাসনের বাধা দূর করল, যা বাজারের তারল্য (লিকুইডিটি) বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি আরও বলেন, একটি ‘এনআইটিএ’ অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্স তালিকাভুক্ত শেয়ার এবং আইপিও কেনার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। সহজীকৃত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক প্রয়োজনীয় কর কেটে রাখার পর—এই অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের পাশাপাশি লভ্যাংশ এবং শেয়ার বিক্রির অর্থ সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রায় অবাধে বিদেশে পাঠানো সম্ভব।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘এনআইটিএ’ যেভাবে কাজ করে
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ গাইডলাইন অনুযায়ী, অনাবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি) এবং বিদেশিরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশ থেকে পাঠানো অবাধে রূপান্তরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে স্থানীয় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন।

বিনিয়োগ শুরু করার জন্য একজন বিনিয়োগকারীর দুটি অ্যাকাউন্ট প্রয়োজন: বিদেশ থেকে টাকা আনা এবং বিদেশে টাকা পাঠানোর জন্য ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্ট এবং শেয়ার কেনার সুবিধার্থে বৈদেশিক মুদ্রাকে টাকায় রূপান্তর করার জন্য এনআইটিএ অ্যাকাউন্ট। এসব হিসাব বাংলাদেশের যেকোনো অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে খুলতে হয়।

সৌজন্যে টিবিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights