প্রকৃতিতে নেই এমন ভাইরাস প্রথমবার তৈরি করল এআই, বিজ্ঞানীদের বড় সাফল্য নাকি নতুন ঝুঁকি

অনলাইন ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে প্রকৃতিতে আগে পাওয়া যায়নি এমন নতুন ভাইরাস তৈরির দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকেরা। তাঁদের তৈরি ১৬টি ভাইরাস পরীক্ষাগারে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। গবেষণাটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করা হলেও একই সঙ্গে জৈবনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি এবং এমআইটি ও হার্ভার্ডের ব্রড ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা তাঁদের এই সাফল্যের কথা জানান।

গবেষকেরা প্রথমে প্রকৃতিতে পাওয়া একটি ফাজ ভাইরাসকে নমুনা হিসেবে ব্যবহার করেন। ফাজ হলো এমন এক ধরনের ভাইরাস, যা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। এরপর এআইয়ের সাহায্যে ওই ভাইরাসের জিনগত কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে হাজার হাজার নতুন জিনোম তৈরি করা হয়।

গবেষণায় তৈরি প্রায় ৩০০টি জিনোম রাসায়নিকভাবে সংশ্লেষণ করে পরীক্ষাগারে পরীক্ষা চালানো হয়। এর মধ্যে ১৬টি ভাইরাস কার্যকর বা ভায়াবল হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

ই কোলাই ধ্বংসে বেশি কার্যকর

গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফল হলো, কৃত্রিমভাবে তৈরি ভাইরাসগুলোর একটি মিশ্রণ প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া ভাইরাসের তুলনায় ই কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে বেশি কার্যকর হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতি দ্রুত পরিবর্তনশীল রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে ফাজ থেরাপি তৈরির নতুন পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ মোকাবিলায় এর সম্ভাবনা রয়েছে।

টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় ও টরন্টো জেনারেল হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আইজ্যাক বোগোচ গবেষণাটিতে যুক্ত ছিলেন না। তিনি বলেন, এআই দিয়ে তৈরি ভাইরাসের সম্ভাব্য উপকার রয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্য করে ফাজ তৈরি করা সম্ভব হলে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী সংক্রমণ মোকাবিলায় নতুন পদ্ধতি পাওয়া যেতে পারে।

তবে একই প্রযুক্তি ক্ষতিকর রোগজীবাণুর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হলে তা গুরুতর জৈবনিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এ কারণে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা, স্ক্রিনিং এবং নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক ঝুঁকি নেই

সিডনির নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি ও বায়োমলিকুলার সায়েন্সেসের অধ্যাপক ফাতেমেহ ভাফায়ি বলেন, গবেষণাটিতে ব্যবহৃত ফাজ ভাইরাস মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে না। ফলে এই গবেষণা থেকে মানুষের জন্য সরাসরি কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি।

তবে তাঁর মতে, মূল উদ্বেগটি অন্য জায়গায়। এআই এখন পুরোপুরি কার্যকর ভাইরাসের নকশা তৈরিতে সক্ষম—এই সক্ষমতাই ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করছে।

তিনি বলেন, এটি এমন নয় যে বর্তমানে কোনো নির্দিষ্ট ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ তৈরি হয়েছে। বরং এআই যে এমন কাজ করতে পারে, সেটিই ভবিষ্যৎ জৈবনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কারণ।

এআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির মধ্যেই নতুন এই গবেষণাটি সামনে এলো। একই সময়ে ক্ষতিকর কাজে এআই ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

যুক্তরাজ্যের সরকারি এআই নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ সংস্থা এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট সম্প্রতি জানিয়েছে, একটি নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআইয়ের উন্নত এআই মডেলগুলো বাস্তব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় ও অনুমোদনহীন ক্ষতিকর কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছিল।

সংস্থাটির তথ্যমতে, এমন একটি ঘটনায় অ্যানথ্রপিকের ক্লদ মাইথোস ৫ একটি ওপেন সোর্স প্রকল্পে ক্ষতিকর কোড ঢোকানোর উদ্দেশ্যে ভুয়া অনলাইন পরিচয় তৈরি করেছিল।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই দিয়ে ভাইরাসের নকশা তৈরি করতে পারা এবং বাস্তবে জটিল ও ক্ষতিকর ভাইরাস তৈরি করা এক বিষয় নয়।

কতটা এগিয়েছে এআই

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের সিনথেটিক জিনোম ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞ টম এলিস বলেন, গবেষণাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি একই সঙ্গে দেখিয়েছে যে বড় ও জটিল জিনোম তৈরির ক্ষেত্রে এআই এখনো অনেক দূরে রয়েছে।

তাঁর মতে, গবেষণায় ব্যবহৃত ফাজ ভাইরাসের জিনোম তুলনামূলকভাবে ছোট এবং সহজ। এ ধরনের ভাইরাস জিনগত পরিবর্তন সহ্য করতে পারে এবং দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে।

তুলনা হিসেবে তিনি বলেন, কোভিড ভাইরাসের জিনোম এই গবেষণায় ব্যবহৃত ফাজের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ দীর্ঘ। জিনোমের আকার ও জটিলতা বাড়ার সঙ্গে এ ধরনের নকশা তৈরির কঠিনতাও অনেক বেড়ে যায়।

এলিসের মতে, জৈবনিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রকৃতিতে থাকা ভাইরাসের পরিবর্তন ও অপব্যবহার এখনো এআই দিয়ে নতুন রোগজীবাণু তৈরির চেয়ে বেশি বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হুমকি।

গবেষণার গুরুত্ব বাড়ছে কেন

সিঙ্গাপুরের এশিয়া সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির পরিচালক হু লি ইয়াং বলেন, এআই ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ভাইরাসকে আরও ক্ষতিকর করার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এই গবেষণার প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, এর অর্থ এই নয় যে বৈজ্ঞানিক ও পরীক্ষাগারভিত্তিক সামান্য জ্ঞান থাকা যে কেউ এখন নিজের বাসায় বসে জীবনরক্ষাকারী বা বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি করতে পারবেন। ভাইরাসের নকশা তৈরির পর বাস্তবে সেটি তৈরি ও পরীক্ষা করার জন্য এখনো উল্লেখযোগ্য পরীক্ষাগার সক্ষমতা প্রয়োজন।

গবেষকেরাও তাঁদের গবেষণাকে সিনথেটিক জিনোম প্রযুক্তির সম্ভাবনা বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে এ প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগানোর পাশাপাশি এর অপব্যবহার ঠেকাতে শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি ও নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights