প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব বাড়ছে?

বিশেষ প্রতিনিধি

একটি রাজনৈতিক সরকারের কর্মসূচি সফল করতে মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভা যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তার সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে সরকারি কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের ওপর। সরকারের সাফল্য এবং ব্যর্থতা তাই অনেকটাই নির্ভর করে আমলা, পুলিশ এবং মাঠ প্রশাসনের দক্ষতার ওপর। অতিরিক্ত আমলা এবং পুলিশ নির্ভরতা যেমন একটি রাজনৈতিক সরকারকে জনবিচ্ছিন্ন করে তোলে। ঠিক তেমনই প্রশাসনের সাথে সমন্বয় না রেখে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা যায় না। তাই প্রশাসনের সাথে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য জরুরি। বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস অতিক্রম করেছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সরকারের মধ্যে আন্তরিকতা এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটাই এই সরকারের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। এই সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করতে চায়, এই বিষয়টি গত ছয় মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার স্পষ্ট করেছে। কিন্তু জনকল্যাণে নিবেদিত সরকার তার কর্মসূচি বাস্তবায়ন কীভাবে করবে তা নিয়ে এখনও অস্পষ্টতা রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের সমীকরণ পরিষ্কার নয়। সরকার যেমন প্রশাসনের। সবার উপর আস্থা রাখতে পারছে না, আবার প্রশাসনের একটি বড় অংশ সরকারকে আপন ভাবতে পারছে না। এই দ্বৈতদ্বন্দ্বের কারণে সরকার যেভাবে এগুতে চাইছে সেভাবে এগিয়ে যেতে পারছে না। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আছে সরকার এবং আমলাদের সম্পর্ক।

একটি সরকার যত জনবিচ্ছিন্ন হয় তত বেশি আমলা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভর করে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আওয়ামী লীগ মনে করেছিল আমলা এবং পুলিশ তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখবে। ২০১৪ সালের ভোট ছাড়া নির্বাচন আওয়ামী লীগ পুলিশ এবং আমলাদের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকে। জনগণের ভোট ছাড়া গঠিত দ্বিতীয় মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার পুরোপুরি আমলাতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত হয়। একইভাবে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের মূল কুশীলব ছিলেন কতিপয় আমলা এবং পুলিশ প্রশাসন। এই দু’টি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুরোপুরি রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে। কতিপয় পুলিশ কর্মকর্তা এবং আমলা হয়ে উঠে ক্ষমতাবান। তারাই দেশ চালিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী এবং এমপিরা হয়ে যায় শোপিস। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল আমলা আর পুলিশ বাহিনী তাদের চিরকাল ক্ষমতায় রাখবে। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন হয়ে একটি সরকার যে ক্ষমতায় টিকতে পারে না ২০২৪ এর আগস্টের আন্দোলন তার প্রমাণ। সরকার যখন আমলাতন্ত্রের হাতে জিম্মি হয়ে যায় তখন তার রাজনৈতিক সংগঠন দূর্বল হতে থাকে এবং এক সময় বিলীন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ তার বড় উদাহরণ। অতিরিক্ত আমলা নির্ভরতার ফলে আমলা এবং পুলিশ বাহিনী তাদের পেশাদারিত্ব হারিয়ে ফেলে। তারা দলীয় ক্যাডারে পরিণত হয়। এখানেও মুষ্টিমেয় কিছু কর্মকর্তা সর্বেশ্বর বনে যায়। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী দেশ চলে। গোটা রাষ্ট্র জিম্মি হয়ে পড়ে কতিপয় আমলা এবং পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। এরফলে জনরোষের পাশাপাশি প্রশাসনেও ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয়। পদোন্নতি বঞ্চিতরা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।

আবার আমলাদের পুরোপুরি উপেক্ষা করলে তারা সরকারের ভালো কাজও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই প্রশাসনের সাথে রাজনৈতিক সরকারের সম্পর্ক হতে হবে অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন দলীয়করণ মুক্ত প্রশাসন। দক্ষতা এবং মেধা ভিত্তিক নিয়মতান্ত্রিক নিয়োগ ও পদোন্নতি। প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আশার কথা, বিএনপি তাদের ৩১ দফা কর্মসূচিতে সুস্পষ্ট ভাবে এইসব ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু সরকারের প্রথম ছয় মাসে ঘোষিত অঙ্গীকার অনুযায়ী প্রশাসনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পদক্ষেপ লক্ষ্যণীয় নয়। ফলে সরকারের সাথে প্রশাসনের আলো- আঁধারি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশাসন সরকারের কাজে কাঙ্খিত সহযোগিতা করছে না। সরকার এবং প্রশাসনের মধ্যে কয়েকটি বিষয়ে টানাপড়েন শুরু হয়েছে।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ-বর্তমান সরকার প্রথম ছয় মাসে প্রশাসনে শীর্ষ পদে আওয়ামী লীগ ও ইউনূস সরকারের দেখানো পথে হাঁটছে। প্রশাসনে আপন লোক খুঁজতে গিয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের ফাঁদে পা দিয়েছে সরকার। প্রশাসনের শীর্ষ পদে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে আটকে যাচ্ছে নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ। একটি সচিব পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ মানেই অন্তত এক বছর সেই পদে নতুন করে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হওয়া। এর প্রভাব পড়ছে নিচের সারির তিন-চারজন কর্মকর্তার ক্যারিয়ারে। বিশেষ করে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব হওয়ার অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও একই কর্মকর্তাকে আবার চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় অসন্তোষ আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসন সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তা রয়েছেন ২২ জন। এর বাইরে গত ২৩ জুলাই নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরও ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এরফলে মেধাবীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন। সরকারের কাজে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক নিয়োগে প্রশাসনে হতাশা-সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে সরকারি দল বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও অঙ্গসংগঠনের সাবেক নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভেতরে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে ঘিরে পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ, উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। যদিও এ নিয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাহসী এবং প্রসংশনীয়। কিন্তু আমলাদের কাছে সরকার এর প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি সরকার। এই প্রতিষ্ঠান গুলোকে গতিশীল করার লক্ষ্যে যে রাজনৈতিক নিয়োগ দেয়া হয়েছে তা আমলাদের বোঝানোর ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি দেখা গেছে।

মাঠ প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি-বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দূরত্ব লক্ষ্য করা গেছে। ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী মাত্র একবার জেলা প্রশাসকদের সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছেন। কিন্তু জেলা প্রশাসক সম্মেলনের বাইরেও নিয়মিত মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি। যেমন হামের টিকা, বিদ‍্যুৎ এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা ও মনিটরিং করা দরকার। দেখা গেছে সরকারের অনেক নির্দেশনা উপজেলা পর্যায়ে উপেক্ষিত হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সরকারের নজরদারি ও মনিটরিং জোরদার করা দরকার।

পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে অস্পষ্টতা-ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিদায় বেলায় নতুন সরকারের ঘাড়ে বিরাট বোঝা চাপিয়ে দিয়ে যায়। সেটা হলো পে স্কেল। এটি কোনভাবেই অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল না। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রচণ্ড অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে ইউনূস সরকারের এই সিদ্ধান্ত সরকারকে আরো বেকায়দায় ফেলেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে সেপ্টেম্বরে নতুন পে স্কেলের গেজেট প্রকাশিত হবে। অক্টোবর থেকে বেতন পাবেন কর্মচারীরা। কিন্তু এই পে স্কেল সরকারের জন্য শাখের করাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকার না পারছে গিলতে না পারছে ফেলতে। এখন দেশে যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তাতে নতুন পে স্কেল কার্যকর করলে অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হবে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে। আবার এটা বাস্তবায়ন না করলে প্রশাসনে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো করতে সরকার রাজনৈতিক সাহস দেখাতে পারছে না বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। বিষয়টিকে ঝুলিয়ে রাখলে সমস্যা কমবে না, বরং যত দেরি হবে, পরিস্থিতি তত জটিল হবে বলে মনে করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত শুদ্ধি অভিযান হয়নি-দীর্ঘ ১৭ বছর প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিএনপির প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগের পতনের পর ড. ইউনূস দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্নে প্রশাসনে বিএনপি বিরোধীদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসায়। কিন্তু বিএনপি ছয় মাসেও প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারেনি। অনেকেই রং বদলে বিএনপির জার্সি গাঁয়ে জড়িয়েছে। বিএনপির জন্য এই গুপ্তরা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
অতি উৎসাহীদের দাপট-বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রশাসনে ও পুলিশ বাহিনীতে নব্য বিএনপির দাপট বেড়েছে। এদের অনেকেই বিএনপির নেতাদের চেয়েও বড় নেতা হয়ে গেছে। প্রশাসনের রদবদল এবং পদোন্নতিতে এদের খবরদারি বেড়েছে। যা প্রশাসনের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে এরফলে যোগ্য, মেধাবীরা বঞ্চিত হচ্ছে। তারা কাজের উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এটা প্রশাসনে একধরনের সমস্যা তৈরি করছে।

গত ছয় মাসে সরকারের পথনকশা স্পষ্ট। সরকার কি করতে চায় তার একটা রূপকল্প পাওয়া গেছে। কিন্তু এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য লাগবে দক্ষ প্রশাসন। যারা সরকারের কর্মসূচি সফল করার লক্ষ্যে কাজ করবে। কিন্তু সরকারের ভেতরে অনেকই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছে না। সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে প্রশাসনকে। সেটা না করতে পারলে সরকারের ভালো উদ্যোগ গুলোও ভেস্তে যেতে পারে। তাই বিএনপি ঘোষিত ৩১ দফার আলোকে প্রশাসনকে ঢেলে সাজাতে হবে জরুরি ভিত্তিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights