প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাছাইয়ে বাদ পড়া সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে আপিল আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করেছেন। গতকাল আপিলের প্রথম দিনে ৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। আপিল চলবে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করবে ইসি। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হবে। মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাই করে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তাতে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪২-এ।

ইসি জানিয়েছে, রংপুর অঞ্চল : ৩, রাজশাহী অঞ্চল : ৫, খুলনা অঞ্চল : ৩, বরিশাল অঞ্চল : ১, ময়মনসিংহ অঞ্চল : ১, ঢাকা অঞ্চল : ১৫, ফরিদপুর অঞ্চল : ৭, কুমিল্লা অঞ্চল : ৫ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চল : ২। তবে কুমিল্লায় একজন বৈধ প্রার্থীর বিরুদ্ধে আপিল হয়েছে। সিলেট অঞ্চল : কেউ আবেদন করেননি। ইসি জানিয়েছে, গতকাল সকাল ১০টা থেকে নির্বাচন ভবনে বিভিন্ন বুথে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের দেওয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন জমা দেন প্রার্থীরা। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন প্রায় ৩৫০ স্বতন্ত্র প্রার্থী; যা মোট বাতিল মনোনয়নত্রের প্রায় অর্ধেক। আর যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন, তাদের তিন চতুর্থাংশই বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন। ৩০০ আসনের বৈধ ও বাতিল মনোনয়নপত্রের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনি এলাকার ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনের তথ্যে গড়মিলে ঝরে পড়েছেন তারা।

আপিল করেছি, আইনি লড়াই চালিয়ে যাব : তাসনিম জারা : ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেছেন ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া তাসনিম জারা। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গতকাল নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে ঢাকা অঞ্চলের বুথে আপিল করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক এ নেত্রী। আপিল প্রক্রিয়া শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা-৯ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। সেটি গ্রহণ হয়নি। তাই আমরা আপিল করছি এবং আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাব। আপনারা দেখেছেন, একদম দেড় দিনের মাথায় প্রায় ৫ হাজার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের স্বাক্ষর দিয়েছেন, অনেক ভালোবাসা দিয়েছেন, নিজেরাই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে বুথ করেছেন। তো এটার প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা আমাদের আইনি লড়াইটা চালিয়ে যাব। যারা সই করেছেন এত অল্প সময়ে, উনারা চান আমি যেন নির্বাচনে কনটেস্ট করতে পারি। তো সেজন্য আমরা আপিল করেছি। এবং আমরা আইনি প্রক্রিয়ার লড়াইটা চালিয়ে যাব। আপিলে জয় পেয়ে ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তাসনীম জারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তার আইনজীবী আরমান হোসেন। এক শতাংশ ভোটারের গড়মিলে বাদ পড়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহাবুদ্দিন। গতকাল আপিল আবেদন জমা দিয়ে তিনি বলেন, লালমনিরহাট-১ আসনে আমি প্রার্থী হয়েছিলাম। বাছাইয়ে দু-তিনজন ভোটারের স্বাক্ষর অস্বীকারের কারণে মনোনয়নপত্র বাদ পড়েছে। আপিলে ইনশাআল্লাহ প্রার্থিতা ফিরে পাব আশা করি। প্রয়োজনে ওই ভোটারদের আপিলের সময় উপস্থিত করব। নরসিংদী-৪ আসন থেকে বাংলাদেশ কংগ্রেসের সম্ভাব্য প্রার্থী কাজী শরিফুল ইসলাম আপিল আবেদন জমা দেওয়া শেষে অভিযোগ করে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলে বিএনপির প্রার্থী তার লোকজন দিয়ে আমার মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেন। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে আমি মনোনয়ন জমা দিলে বিএনপির প্রার্থী লোকজন আমার প্রস্তাবকে নিয়ে হাজির হয় এবং সে বলে যে স্বাক্ষরটি আমি দিইনি। যে কারণে আমার মনোনয়নটি বাতিল। আমি আপিল করেছি আশা করি আমি প্রার্থিতা ফেরত পাব। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কিশোরগঞ্জ ১ আসনের হেদায়েতুল্লাহ বলেন, হলফনামায় আমার একটা সামান্য ভুল হয়েছিল, বাছাইয়ে বাতিল হয়েছে মনোনয়নপত্র। আপিলে যুক্তিযুক্ত কারণ তুলে ধরব, আশা করি প্রার্থিতা ফিরে পাব। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাইবাছাই করে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল করেছেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। তাতে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪২ জন। এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ৪৭৮ জন মনোনয়নপত্র জমা দেন। বাছাইয়ে বাদ পড়েছে অন্তত ৩৫০ জন। এই সংখ্যা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রায় ৭৩ শতাংশ এবং বাতিল হওয়া মোট প্রার্থীর ৪৮ শতাংশ।

মনোনয়নপত্র বাতিলের পাশাপাশি বৈধ প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও আপিল করার সুযোগ রয়েছে। সোমবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি আপিল আবেদন নিষ্পত্তি করবে ইসি। ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হবে। এরপর নির্ধারণ হবে চূড়ান্ত প্রার্থী। ভোট গ্রহণ হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।

আপিল দায়েরের নিয়ম : আপিল করার নিয়ম জানিয়ে দেওয়া নোটিশে জানানো হয়, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী বা কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরবর্তী ৫ দিনের মধ্যে (৯ জানুয়ারি) নির্বাচন কমিশন বরাবর আপিল দায়ের করতে পারবেন। আপিল আবেদন ১ সেট মূল কাগজপত্র এবং ৬ সেট ছায়ালিপি (ফটোকপি) মেমোরেন্ডাম আকারে জমা দিতে হবে।

আঞ্চলিক বুথ ভিত্তিক দায়িত্ব বন্টন : আপিল গ্রহণের সুবিধার্থে সারা দেশকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করে বুথ স্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের প্রার্থীরা নির্ধারিত বুথে তাদের আপিল জমা দিতে পারবেন।

নির্বাচন ভবনের অডিটোরিয়ামে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে শুনানি শুরু হচ্ছে। আপিল নম্বর অনুযায়ী শুনানির তারিখগুলো হলো ১০ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ০১-৭০, ১১ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ৭১-১৪০, ১২ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ১৪১-২১০, ১৩ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ২১১-২৮০, ১৪ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ২৮১-৩৫০, ১৫ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ৩৫১-৪২০, ১৬ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ৪২১-৪৯০, ১৭ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ৪৯১-৫৬০ এবং ১৮ জানুয়ারি : আপিল নম্বর ৫৬১ হতে অবশিষ্ট সব।

রায়ের অনুলিপি বিতরণ শুনানি শেষে আপিলের ফলাফল মনিটরে প্রদর্শন করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ই-মেইলে রায়ের পিডিএফ কপি পাঠানো হবে। এ ছাড়া নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী নির্বাচন ভবনের অভ্যর্থনা ডেস্ক থেকে রায়ের অনুলিপি সংগ্রহ করা যাবে।

১০ থেকে ১২ জানুয়ারির শুনানির রায় ১২ জানুয়ারি, ১৩ থেকে ১৫ জানুয়ারির রায় ১৫ জানুয়ারি এবং ১৬ থেকে ১৮ জানুয়ারির রায় ১৮ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পরিস্থিতি ও আপিলের সংখ্যা বিবেচনায় এ সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে। শুনানির সময় সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার বা তার প্রতিনিধি এবং আপিলকারীকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকার জন্য নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights