লাইটার কারখানায় ভয়াবহ আগুন, ছয় লাশ উদ্ধার

কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর বউবাজারে একটি লাইটার ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এতে আগুনে পুড়ে মারা গেছেন ফ্যাক্টরির ভিতরে থাকা ছয় শ্রমিক। আগুন নেভানোর পর তাদের লাশ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। তাদের লাশ পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। দাফন-কাফন ও প্রাথমিক সহায়তার জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গতকাল বেলা পৌনে ১টায় বউবাজার এলাকার এসআর গ্যাস প্রো-লাইটার ফ্যাক্টরিতে এ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের সাতটি ইউনিট এসে পৌনে ২ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কারখানায় প্রায় শতাধিক শ্রমিক ছিলেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেকেই দৌড়ে বেরিয়ে আসেন। অগ্নিকাণ্ডের সময় ফ্যাক্টরির ভিতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণের শব্দে আশপাশর এলাকা প্রকম্পিত হয়। এতে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুন দেখে স্থানীয়রা জরুরি সেবা ট্রিপল নাইনে ফোন করে খবর দিলে প্রথমে কেরানীগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে আগুন নেভাতে শুরু করে। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে স্থানীয়দেরও আগুন নেভাতে দেখা যায়। পরে ঢাকা থেকে আরও চারটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে আগুন নেভায়। স্থানীয়রা জানান, এ কারখানায় এর আগেও ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তারা আবার কীভাবে প্রশাসনকে ম্যানেজ করে কারখানা চালু করেছে জানি না। ঢাকা বিভাগের ফায়ার সার্ভিস উপ-পরিচালক ছালেহ উদ্দিন বলেন, কারখানা মালিকদের ব্যাপক গাফিলতি ও কারখানাটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল না। গ্যাসলাইটার কারখানায় দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আরেকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাদের পরিচয় এখনো যানা যায়নি। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, পোড়া কারখানার ভিতর থেকে একে একে পাঁচটি লাশ উদ্ধার করে আনছেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। পরে লাশগুলো পুলিশের পিকআপভ্যানে রাখা হয়। এরপর লাশগুলো ফায়ার সার্ভিসের অ্যাম্বুলেন্সে পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মৃত ব্যক্তিরা পুরুষ না নারী, সে বিষয়েও নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আফতাব আহমেদ জানান, নিহতদের পরিবারকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফন-কাফন ও প্রাথমিক সহায়তার জন্য ২৫ হাজার টাকা করে অনুদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর আগে ঘটনাস্থলে আহাজারি করছিলেন কুলসুম বেগম নামের এক নারী। তার ছেলে নাঈম (১৭) আগুনে পুড়ে যাওয়া আকরাম গ্যাসলাইটার কারখানায় কাজ করে। তিনি বলছিলেন, আমরা গোলামবাজার এলাকায় থাকি। তিন মাস আগে ছেলে এ কারখানায় কাজে ঢোকে। সকাল ৮টার দিকে কাজের উদ্দেশ্যে ছেলে বের হয়। আগুন লাগার পর থেকে তার খোঁজ নেই। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই। কারখানার সামনে নিজ সন্তানের জন্য অপেক্ষা করছিলেন কাওসার সরদার নামের এক ব্যক্তি। তার ১২ বছর বয়সি মেয়ে মনিরাও এ কারখানায় কাজ করে। তিনি বলেন, প্রায় এক বছর ধরে আমার মেয়ে কারখানাটিতে কাজ করছিল। লোকমুখে জানতে পারি এখানে আগুন লেগেছে। তৎক্ষণাৎ এখানে এসে মেয়ের খোঁজ করছি। কিন্তু মেয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। ঢাকা জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নিখোঁজ শ্রমিকদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

দগ্ধদের তিনজনই নারী : কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাহাঙ্গীর আলম সর্বশেষ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন, কেরানীগঞ্জের গ্যাস লাইটার কারখানায় আগুনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ছয় লাশের মধ্যে তিনজনই নারী। তাদের মধ্যে শুধু মিম আক্তার পাখির পরিচয় পাওয়া গেছে। সে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আমবাগিচায় থাকেন। তার পিতার নাম দেলোয়ার হোসেন। লাশগুলো অতিরিক্ত পুড়ে যাওয়ায় প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া তারা নারী না পুরুষ, তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। পুলিশ এ নিয়ে কাজ করছে।

সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি জানান, কেরানীগঞ্জ আমবাগিচায় গ্যাস লাইটার কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত ও আহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং নিহতদের পরিবারকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। পাশাপাশি আহতদের চিকিৎসার সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং তাদের পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে দেওয়া হবে। আগুনে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুর্ঘটনার খবর জানার পরপরই স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights