বগুড়ায় ভরা মৌসুমে বেড়েছে চালের দাম

বিশেষ প্রতিনিধি, বগুড়া

বগুড়ার পাইকারিতে বিভিন্ন জাতের চালের দাম কেজিপ্রতি ২ থেকে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি চালের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত। এদিকে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখীতে বিপাকে পড়েছেন স্বল্প আয়ের মানুষ।

ক্রেতাদের অভিযোগ, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সুযোগ বুঝে চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভারতীয় চাল আসা কমে গেছে। এলসিও বন্ধের মতো পরিস্থিতি হয়েছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে আসায় প্রভাব পড়ছে বাজারে। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ঈদকে ঘিরে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তাদেরও বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ওএমএস (খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি) কর্মসূচি সচল রাখা হয়েছে। এছাড়া অবৈধ মজুত খুঁজে বের করতে জেলার বিভিন্ন মিল পরিদর্শন করা হচ্ছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, ৫০ কেজির বস্তায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। বাজারে প্রতি কেজি আটাশ চাল ৫৫ থেকে ৫৭ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ৫৩ থেকে ৫৪ টাকা। মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৬৬ থেকে ৭০ টাকায়, আগে ছিল ৬৩ থেকে ৬৭ টাকা। নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৭২ থেকে ৭৮ টাকায়, আগে ছিল ৬৮ থেকে ৭০ টাকা।

জানা যায়, উত্তরাঞ্চলের মধ্যে সবজি ও ধান-চাল উৎপাদনকারী জেলা বগুড়া। ইরি-বোরো মৌসুম মাত্র শেষ হয়েছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ফসল ভালো হয়েছে। তারপরও হঠাৎ চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রকারভেদে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। আর খুচরা বাজারে বেড়েছে ৫ থকে ৬ টাকা। পাইকারিতে চালের দাম বাড়ায় স্থানীয় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত নতুন ধান বাজারে আসায় চালের দামে স্বস্তি ফেরার প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু ভরা মৌসুমেও জেলার চালের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, ঈদুল আজহার পর মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তাপ্রতি দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে সাধারণ ক্রেতাদের ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

চাল ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের দাবি, মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। ধানের উচ্চমূল্য, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের বাড়তি খরচ এবং ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত চালের বাজারে পড়ছে।

এবার জেলায় অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ ২০২৬ মৌসুমের আওতায় সররকারি প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা, প্রতি কেজি সিদ্ধ চালের সংগ্রহ মূল্য ৪৯ টাকা, প্রতি কেজি আতপ চালের মূল্য ৪৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে জেলায় ১৭ হাজার ৭৮১ মেট্রিক টন ধান, ৭২ হাজার ৬০২ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ হাজার ৮১১ মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বগুড়া শহরের কলোনী এলাকার চাল ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন জানান, হঠাৎ পাইকারীতে কেজি প্রতি ২ থেকে ৩ টাকা চালের দাম বেড়েছে। ইরি-বোরো মৌসুমের শেষদিকে বাজারে ধানের সরবরাহ কমে এসেছে। বর্তমানে যে ধান বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। তার বড় অংশই মজুতকারীদের নিয়ন্ত্রণে। ফলে ধানের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

তিনি বলেন, এ সময়ে সাধারণত চালের দাম কমে। কিন্তু এবার উল্টো প্রতি বস্তায় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ধানের দাম ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।

মিল মালিকরা জানান, ধানের মৌসুমে বগুড়ার মিলগুলো থেকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হতো। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টনে। মিল মালিকদের দাবি, উৎপাদন ব্যয়ের বড় অংশই এখন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নির্ভর। একটি অটোরাইস মিলে চাল উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় হয়।

বগুড়া সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হারুন-উর-রশিদ জানান, চালের বাজার স্বাভাবিক রাখতে জেলায় ১৭জন ডিলারের মাধ্যমে ওএমএস (খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রি) কর্মসূচি সচল রাখা হয়েছে। এছাড়া যদি কেউ অবৈধভাবে মজুদ করে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights