বড় চমক স্বাস্থ্য-শিক্ষায় বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ
শাহেদ আলী ইরশাদ
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে নজিরবিহীন বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ঘিরে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য পরিচিত মন্ত্রণালয়গুলোতে হঠাৎ বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেওয়া একটি ‘উচ্চঝুঁকির বাজি’ হয়ে উঠতে পারে। এতে বিপুল অর্থ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকারি সূত্র জানায়, গত সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন করেছে। সেখানে সামাজিক অবকাঠামো খাতে বড় ধরনের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, যা প্রায়ই উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে দুর্বল পারফরমার হিসেবে চিহ্নিত হয়, সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৭৬০ শতাংশ বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বরাদ্দ ছিল ৩১ দশমিক ১৭ বিলিয়ন টাকা। নতুন এডিপিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকায়। একইভাবে স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ পেয়েছে ৫১১ শতাংশ বেশি বরাদ্দ। সংশোধিত এডিপিতে এ বিভাগের বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা, যা নতুন অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। শিক্ষা খাতেও বড় ধরনের বরাদ্দ বৃদ্ধি হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ পেয়েছে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা চলতি সংশোধিত এডিপির ৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকার তুলনায় ২৩৭ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৯ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা, যা সংশোধিত এডিপির ৮ হাজার ৫৪ কোটি টাকার তুলনায় ১৪১ শতাংশ বেশি। অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারণ বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এত বড় বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যয় করার সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর রয়েছে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তাঁদের মতে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাত দীর্ঘদিন ধরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ধীরগতির ক্রয়প্রক্রিয়া, দক্ষ প্রকল্প পরিচালকের অভাব এবং দুর্বল সুশাসনের সমস্যায় ভুগছে। ফলে প্রতি বছরই মাঝপথে উন্নয়ন বাজেট কাটছাঁট করতে হয়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দকৃত এডিপির মাত্র ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে, যা সব মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সবচেয়ে কম। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যুদ্ধের অর্ধেক মাত্র; মূল চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়নে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, জবাবদিহি ও প্রকল্প তদারকি ব্যবস্থায় দ্রুত সংস্কার না আনলে এসব ঐতিহাসিক বরাদ্দ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গ্রামীণ স্বাস্থ্য অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোর শিক্ষা ঘাটতি কাটিয়ে উঠতেই সরকার এই উচ্চাভিলাষী বরাদ্দ দিয়েছে। যদিও সমালোচকদের মতে, ঘোষিত বরাদ্দ ও প্রকৃত ব্যয়ের মধ্যে বড় ব্যবধান এখন বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহে এনইসিতে বরাদ্দ অনুমোদনের আগে অনুষ্ঠিত এক সংলাপেও ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এদিকে সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার সম্প্রসারণমূলক উন্নয়ন বাজেট গ্রহণ করেছে, যা চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির তুলনায় ৩০ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং সংশোধিত এডিপির তুলনায় ৫০ শতাংশ বেশি। এই সম্প্রসারণমূলক এডিপি আগের অন্তর্বর্তী সরকারের অনুসৃত মিতব্যয়ী ব্যয়নীতির বিপরীতধর্মী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমালোচকদের উদ্বেগের জবাবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অর্থনীতির স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে বড় ধরনের অর্থপ্রবাহ জরুরি। তিনি এ বিনিয়োগকে শুকিয়ে যাওয়া নলকূপে আবার পানি তোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করার সঙ্গে তুলনা করেন।
