বর্ষায় পানিবন্দি হাওরাঞ্চল, চরম ভোগান্তিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি

বর্ষা এলেই পানিতে তলিয়ে যায় সড়ক। নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় থাকে না। বছরের পর বছর ধরে এমন দুর্ভোগের মধ্যেই জীবনযাপন করছেন মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলের হাজারো মানুষ। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা।

মৌলভীবাজার জেলায় এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ হাকালুকি হাওর, কাউয়াদীঘি হাওর, বাইক্কা বিলসহ ছোট-বড় অন্তত আটটি হাওর রয়েছে। বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই এসব হাওরপাড়ের অধিকাংশ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে নৌকাই হয়ে ওঠে মানুষের একমাত্র ভরসা।

রাজনগর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের আব্দুল্লাহপুর, আমিরপুর ও নোয়াগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, তিনটি গ্রামের প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষ শহর, উপজেলা সদর ও আঞ্চলিক সড়কে যাতায়াতের জন্য একটি মাত্র কাঁচা রাস্তার ওপর নির্ভরশীল। বর্ষার পানিতে রাস্তাটি সম্পূর্ণ তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা। একই চিত্র জেলার হাকালুকি হাওরবেষ্টিত কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ প্রায় সব হাওরপাড়ের গ্রামেই।

বর্ষায় অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ ও নিচতলা পানিতে ডুবে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রবল বৃষ্টির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে সাহস পান না। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আল-আমিন বলেন, বর্ষা এলেই হাওরপাড়ের মানুষ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। একটি রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেলে বাজার, স্কুল ও হাসপাতালে যেতে নৌকার ওপর নির্ভর করতে হয়। জরুরি প্রয়োজনে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

আরেক বাসিন্দা বাহাদুর মিয়া বলেন, ঝড়-বৃষ্টির সময় সন্তানদের নৌকায় করে স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। অনেক সময় বাধ্য হয়ে বাড়িতেই রাখতে হয়, ফলে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হয়।

কৃষক কনর মিয়া বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে যেমন কষ্ট হয়, তেমনি অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

শুধু শিক্ষাই নয়, স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনো টেকসই সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। কাঁচা ও ভাঙাচোরা সড়ক বর্ষায় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জরুরি রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয় না। অনেক সময় নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে রোগীর অবস্থা আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে।

হাওরপাড়ের বাবুর বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অনিমেষ দেব বলেন, বর্ষাকালে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। অনেক শিক্ষার্থী নৌকায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত হলে শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত হবে।

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. তাহমিদুল হক চৌধুরী বলেন, হাওরাঞ্চল থেকে অনেক রোগী সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। বিশেষ করে প্রসূতি, শিশু ও জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে যোগাযোগ সংকট বড় বাধা। উন্নত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত হলে অনেক মূল্যবান প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শিব্বির মিয়া বলেন, হাওরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে টেকসই সড়ক, উঁচু বাঁধসড়ক, সেতু ও প্রয়োজনীয় ঘাট নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights