বাংলাদেশের ‘চায়না মোমেন্ট’: সম্ভাবনা ও কিছু কথা

বিশেষ প্রতিনিধি
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে দুই দেশের মধ্যে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা ও দলীয় পর্যায়ে বেশ কিছু বড় চুক্তি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে নতুন এই সম্পৃক্ততার গতি ও বিস্তৃতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে যে, —নিজস্ব কৌশল’ অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলাদেশ কীভাবে এর সর্বোচ্চ সুফল নিশ্চিত করতে পারে?

এবারের সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারক। সাধারণ রাষ্ট্রীয় কূটনীতির বাইরে গিয়ে এ ধরনের চুক্তি দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে। বেইজিংয়ের বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রসারের অংশ হিসেবে সিপিসি তাদের আন্তর্জাতিক বিভাগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়েই দীর্ঘকাল ধরে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলছে। প্রবাসীদের সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে দেশটির ‘ইউনাইটেড ফ্রন্ট ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্ট’-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন গবেষকরা।

দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে শিক্ষা। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউট’ রয়েছে এবং নতুন চুক্তির আওতায় এমন আরও কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে ভাষা শিক্ষা, বৃত্তি ও শিক্ষাবিনিময়ের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রতিষ্ঠান গভীর পর্যবেক্ষণের মুখেও পড়েছে।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম ‘চায়না মিডিয়া গ্রুপ’ (সিএমজি) কনটেন্ট শেয়ারিং, সাংবাদিকদের পারস্পরিক সফর এবং স্থানীয় সম্প্রচারকদের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাদের সম্পৃক্ততা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া কূটনীতিতে এমন অংশীদারত্ব সাধারণ বিষয় হলেও, এর মাধ্যমে বেইজিং বিদেশে নিজেদের বয়ান প্রচারের বড় সুযোগ পাচ্ছে।

চীনের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা সমানভাবে দৃশ্যমান অবকাঠামো খাতে। মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, এর কাছাকাছি প্রস্তাবিত চীনা শিল্পপার্ক এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল—বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের বড় সম্ভাবনা জাগিয়েছে। দূরদর্শিতার সঙ্গে পরিচালিত হলে এসব প্রকল্প বাংলাদেশের দারুণ উন্নয়ন ঘটাতে পারে। তবে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা বলে, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।

অর্থনৈতিক নির্ভরতার বিষয়টিও সমান মনোযোগ দাবি করে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বার্ষিক ২ হাজার ৪০০ কোটি (২৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড়িয়েছে, কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ সামান্য। তাই ভবিষ্যৎ আলোচনায় শুধু বিনিয়োগ আকর্ষণ নয়, বরং বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর দিকেও জোর দিতে হবে।

এসব পর্যালোচনার অর্থ এই নয় যে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করা যাবে না। বাংলাদেশের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং বহুমুখী অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রয়োজন, যেখানে চীন বড় অবদান রাখতে পারে। তবে সফল অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ভারসাম্যপূর্ণ আলোচনার ভিত্তিতে।

বেইজিংয়ের সঙ্গে ঢাকার ক্রমবর্ধমান এই ঘনিষ্ঠতার মাঝে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সমান স্পষ্টতা, আত্মবিশ্বাস ও দূরদর্শিতার সঙ্গে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে কি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights