বাংলাদেশ-ভারত ১০১ চুক্তির পর্যালোচনা: বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা, ভারতের উদ্বেগ
ড. মো. মিজানুর রহমান
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক শুধু দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়; এটি ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, পানি, জ্বালানি, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। গত দেড় দশকে দুই দেশের মধ্যে বিপুলসংখ্যক সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এখন আগের সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনার উদ্যোগ নেওয়ায় বিষয়টি জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। তবে এই পর্যালোচনাকে শুধু অতীতের কোনো সরকারের সিদ্ধান্তের বিচার হিসেবে দেখলে এর গুরুত্ব সীমিত হয়ে যাবে। বরং এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চুক্তি করার পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার একটি সুযোগ।
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানান, ভারতের সঙ্গে আগের সরকারের করা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পরে তিনি স্পষ্ট করেন, উদ্দেশ্য সব চুক্তি বাতিল করা নয়; বরং যেসব ধারায় বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে অসামঞ্জস্য পাওয়া যাবে, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া। অর্থাৎ, উদ্দেশ্য চুক্তি বাতিল নয় বরং প্রতিটি চুক্তি বাংলাদেশকে কী দিয়েছে, কী দায় তৈরি করেছে এবং ভবিষ্যতে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব কী হতে পারে তার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন।
এই চুক্তির মধ্যে কোনোটি সাংস্কৃতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার সমঝোতা, কোনোটি বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, কোনোটি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি-সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি, আবার কোনোটি বন্দর, যোগাযোগ, বিনিয়োগ বা অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু ‘ভারতের সঙ্গে চুক্তি’-এই পরিচয়ে কোনো নথিকে বাংলাদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে চিহ্নিত করা সঠিক নয়। প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে উদ্দেশ্য, শর্ত, মেয়াদ, আর্থিক দায়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি, প্রাপ্ত সুবিধা, সুযোগ ব্যয় ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি বিবেচনা করে।
একটি চুক্তি ভারতের জন্য লাভজনক হলেই তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকর হবে-এমন কোনো অর্থনৈতিক সূত্র নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উভয় পক্ষের লাভ স্বাভাবিক। বাংলাদেশের প্রশ্ন হওয়া উচিত, ভারত যে সুবিধা পাচ্ছে তার বিপরীতে বাংলাদেশ যথাযথ অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে কি না। দুই পক্ষই লাভবান হলে এবং সুবিধা ও দায়ের বণ্টন যুক্তিসঙ্গত হলে শুধু অপর পক্ষ লাভবান হচ্ছে বলে চুক্তি পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাংলাদেশের সম্পদ, অবকাঠামো বা বাজার ব্যবহারের বিনিময়ে যথাযথ মূল্য না পাওয়া গেলে, কিংবা ভবিষ্যৎ দায়ের তুলনায় প্রত্যাশিত সুবিধা কম হলে পুনর্মূল্যায়নের যৌক্তিকতা তৈরি হবে। চুক্তি যেহেতু দুই পক্ষের অঙ্গীকারের ভিত্তি, তাই এর মধ্যে ন্যায্যতা ও পারস্পরিক অধিকার রক্ষা করা শুধু অর্থনৈতিক বিচারে নয়, নৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী মূল্যবোধেও অঙ্গীকার রক্ষা এবং লেনদেনে ইনসাফের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে মিরসরাইয়ের ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পটির জমির পরিমাণ, বিনিয়োগ কাঠামো ও বাস্তবায়ন নিয়ে ভিন্ন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। তাই রাজনৈতিক বক্তব্যের পরিবর্তে দেখতে হবে কত জমি বাস্তবে বরাদ্দ হয়েছে, কত অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে, কত শিল্পপ্রতিষ্ঠান এসেছে, কর্মসংস্থান কত হয়েছে এবং রপ্তানি ও রাজস্বে কী অবদান তৈরি হয়েছে। কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে জমির মূল্য ছাড়াও অন্য প্রকল্পে ব্যবহারের সম্ভাব্য সুযোগ ব্যয় হিসাব করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদেশি অংশীদারের ভূমিকা, বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ব্যয় এবং বিনিয়োগকারীর দায়বদ্ধতাও বিবেচনায় আসা উচিত। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্পদও এক অর্থে একটি আমানত; এর ব্যবহার এমনভাবে হওয়া প্রয়োজন, যাতে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উভয়ের স্বার্থ বিবেচনায় থাকে।
সমুদ্র, তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও দীর্ঘমেয়াদি। সমুদ্রসীমায় বিদেশি কোম্পানিকে অনুসন্ধানের সুযোগ দেওয়া মানে শুধু বর্তমান বিনিয়োগ নয়; এর সঙ্গে ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অধিকারও যুক্ত। ভারতীয় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ওএনজিসির বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে অনুসন্ধানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে এ ধরনের চুক্তির ফলাফল বহু বছর অনিশ্চিত থাকতে পারে। তাই ভবিষ্যতের চুক্তিতে অনুসন্ধানের সময়সীমা, বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা, বাণিজ্যিক আবিষ্কার না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এবং সম্পদ ব্যবহারের শর্ত স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বন্দর, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক যোগাযোগ এই পর্যালোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগে বিশেষ সুবিধা তৈরি করেছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট রুটে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে ভারত পরিবহন ব্যয় ও সময় কমাতে পারে। বাংলাদেশেরও রয়েছে বন্দর ব্যবহার ফি, পরিবহন আয়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির সম্ভাবনা। তাই প্রশ্ন হওয়া উচিত ভারতকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে কি না নয়; বরং বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধার যথাযথ অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ ও আদায় করা হয়েছে কি না। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সরকারি বক্তব্যে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো কোনো ব্যবস্থায় বিদেশি জাহাজের সম্ভাব্য অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগটির সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও বন্দর বিধি পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তবে বৃহত্তর প্রশ্ন হলো-বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক ও রেল অবকাঠামো ব্যবহারের বিনিময়ে রাজস্ব, অবকাঠামো ব্যয় এবং স্থানীয় অর্থনীতির লাভ যথাযথভাবে হিসাব করা হচ্ছে কি না।
বিদ্যুৎ খাতেও পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন জরুরি। কোনো বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তিকে শুধু প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম দিয়ে বিচার করলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না। ক্ষমতা বাবদ অর্থপ্রদান, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রায় দায়, চুক্তির মেয়াদ, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবহারযোগ্যতা, বিকল্প উৎসের মূল্য এবং ভবিষ্যৎ চাহিদা-সবই বিবেচনায় নিতে হয়। আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তি নিয়ে ২০২৬ সালের পর্যালোচনা ও বিতর্ক এর একটি উদাহরণ। রয়টার্সের জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পর্যালোচনা কমিটির মূল্যায়নের ভিত্তিতে চুক্তিমূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কথা এবং কিছু প্রক্রিয়াগত প্রশ্নের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল; একই সঙ্গে আদানি পক্ষ জানিয়েছিল যে তাদের ওই পর্যালোচনায় পরামর্শ করা হয়নি। এতে বড় বাণিজ্যিক চুক্তির আগে স্বাধীন মূল্যায়ন এবং পরে দুই পক্ষের বক্তব্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়।
পানি প্রশ্নও এই পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে এর ভবিষ্যৎ কাঠামো নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর ভারতও দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলছে। এই পর্যালোচনা এবং গঙ্গা চুক্তির নবায়ন আলাদা বিষয় হলেও উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পরিবর্তিত জলবায়ু, জনসংখ্যা, কৃষি, পরিবেশ ও পানির চাহিদাকে কীভাবে প্রতিফলিত করা হবে, সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
চুক্তি পরিবর্তন বা বাতিলের ক্ষেত্রে আবেগের পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন ও সংশ্লিষ্ট নথির শর্তকে প্রাধান্য দিতে হবে। ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা কনভেনশনের ২৬ অনুচ্ছেদ কার্যকর চুক্তি সৎভাবে পালনের নীতি স্বীকার করে এবং ২৭ অনুচ্ছেদে অভ্যন্তরীণ আইনকে সাধারণভাবে চুক্তি পালনে ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ সীমিত করা হয়েছে। একই কনভেনশনে পারস্পরিক সম্মতি, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যাহার, গুরুতর লঙ্ঘন বা মৌলিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মতো কিছু আইনি পথও রয়েছে। তবে এগুলোর প্রয়োগ কঠোর শর্তসাপেক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির ভাষা ও কাঠামো দেখে নির্ধারণ করতে হবে। সরকার পরিবর্তন বা কোনো চুক্তি রাজনৈতিকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে পড়া নিজে থেকেই তা বাতিলের স্বয়ংক্রিয় ভিত্তি নয়। চুক্তি করা যেমন দায়িত্ব, তেমনি তা ন্যায়সংগতভাবে পালন করাও দায়িত্ব।
এখানে ‘চুক্তি’, ‘সমঝোতা স্মারক’ ও ‘বাণিজ্যিক চুক্তি’র পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। নথির নামের ওপর ভিত্তি করে তার আইনি বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা যায় না। পক্ষগুলোর উদ্দেশ্য, ভাষা, অনুমোদন, কার্যকর হওয়ার পদ্ধতি এবং বিরোধ নিষ্পত্তির ধারা বিবেচনা করতে হয়। কোনো বাণিজ্যিক চুক্তিতে সালিশি ব্যবস্থা, জাতীয় আইন ও ক্ষতিপূরণের বিধানও থাকতে পারে। তাই এসব নথির ক্ষেত্রে প্রথম কাজ হওয়া উচিত একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি শ্রেণিবিন্যাস।
অর্থনৈতিক পর্যালোচনাও নথিভিত্তিক হওয়া দরকার। বন্দর ব্যবহারে রাজস্বের পাশাপাশি অবকাঠামোর ওপর চাপ ও সুযোগ ব্যয়; বিদ্যুৎ চুক্তিতে ইউনিটমূল্যের পাশাপাশি ক্ষমতা বাবদ অর্থপ্রদান ও বৈদেশিক মুদ্রার দায়; অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও কর; আর প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে অনুসন্ধান ব্যর্থতার ঝুঁকির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সম্পদের ওপর রাষ্ট্রীয় অধিকার-সবকিছুকে একই কাঠামোয় আনতে হবে। এ ধরনের হিসাব ছাড়া ‘জাতীয় স্বার্থ’ কথাটি রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ভারতের প্রতিক্রিয়াও বাস্তবতার সঙ্গে বিচার করা প্রয়োজন। ১৮ সেপ্টেম্বর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, পর্যালোচনার বিষয়ে ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি এবং ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। এটিকে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করার ভিত্তি নেই। তবে এতে বোঝা যায়, সংশ্লিষ্ট চুক্তিগুলোর কিছু বিষয় ভারত তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিবেচনা করে।
বাংলাদেশের জন্য এখানে ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। ভারতের বৈধ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পরিচালনা করা বাস্তবসম্মত নয়; আবার ভারতের স্বার্থ বিবেচনা করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বার্থও উপেক্ষা করা যায় না। কূটনৈতিক সাফল্য হবে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে স্বার্থের সংঘাত থাকলে দর-কষাকষি হবে এবং পারস্পরিক সুবিধা সম্ভব হলে সহযোগিতা বাড়বে। বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতাও সব খাতে সমান নয়। বাংলাদেশের বন্দর ও ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারতের বাজার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পণ্য সরবরাহ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ থেকে সুবিধা পায়। তাই কোনো একটি খাতে বাংলাদেশ শক্তিশালী হলেও অন্য খাতে তার নির্ভরতা বেশি হতে পারে। এই বাস্তবতা স্বীকার করেই পুনঃআলোচনা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে ভারতের পাশাপাশি চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো বাংলাদেশের বিকল্পও বাড়াতে পারে।
সবচেয়ে প্রয়োজন একটি স্থায়ী রাষ্ট্রীয় চুক্তি-নীতি। সংশ্লিষ্ট নথিগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকায় স্বাক্ষরের তারিখ, মেয়াদ, উদ্দেশ্য, আর্থিক দায়, বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে বড় অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, বিনিয়োগ বা প্রাকৃতিক সম্পদসংক্রান্ত চুক্তির আগে স্বাধীন অর্থনৈতিক ও আইনগত মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। চুক্তিতে পুনঃআলোচনার সুযোগ, বাস্তবায়নের পরিমাপযোগ্য সূচক এবং প্রয়োজনে সংশোধনের কাঠামোও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।
একই মানদণ্ড সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা অন্য কোনো দেশের সঙ্গে করা চুক্তি যদি একই অর্থনৈতিক, আইনগত ও কৌশলগত মানদণ্ডে মূল্যায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি আরও বিশ্বাসযোগ্য হবে। এতে কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে কেন্দ্র করে চুক্তি পর্যালোচনার অভিযোগও কমবে এবং জাতীয় স্বার্থের একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংজ্ঞা তৈরি হবে।
শেষ পর্যন্ত এই পর্যালোচনার সাফল্য কতগুলো চুক্তি বাতিল হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। যে চুক্তি বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ, তা বহাল থাকবে; যেখানে সংশোধনের প্রয়োজন, সেখানে আলোচনা হবে; আর যেখানে গুরুতর আইনগত বা অর্থনৈতিক সমস্যা রয়েছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট চুক্তির বিধান ও প্রযোজ্য আইনের কাঠামোর মধ্যেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ তাই অতীতের সব চুক্তি অস্বীকার করা কিংবা সব চুক্তি অপরিবর্তিত রাখার মধ্যে নয়। ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে এমন একটি সম্পর্ক কাঠামোতে, যেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ, অর্থনৈতিক লাভ, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন যেমন গুরুত্ব পাবে, তেমনি ভারতের বৈধ স্বার্থও আলোচনার টেবিলে থাকবে। এই উদ্যোগ যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তৈরি করতে পারে যে আন্তর্জাতিক চুক্তি আবেগ দিয়ে নয়, তথ্য, অর্থনীতি, আইন ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে করতে হবে, তাহলে এর গুরুত্ব একটি নির্দিষ্ট সময়ের রাজনৈতিক বিতর্ককে ছাড়িয়ে যাবে।
অতএব, এই পর্যালোচনাকে ভারতবিরোধী উদ্যোগ কিংবা অতীতের সব সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণের প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সুযোগ হিসেবে দেখা অধিক ফলপ্রসূ। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রেও ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও অঙ্গীকারের মূল্য অস্বীকার করা যায় না। প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, সহযোগিতাও থাকবে; তবে সেই সহযোগিতা হবে আরও স্বচ্ছ, পরিমাপযোগ্য, পারস্পরিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। একটি পরিণত রাষ্ট্রের জন্য শেষ পর্যন্ত সেটিই গুরুত্বপূর্ণ—বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু বন্ধুত্বের ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ; চুক্তি থাকবে, কিন্তু চুক্তির ভিত্তি হবে অঙ্গীকার রক্ষা, ন্যায়সংগততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ইনসাফ।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
Mizan12bd@yahoo.com
