বাঙালির গৌরব আর অহঙ্কারের দিন আজ

এম. নজরুল ইসলাম

বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় দিন আজ। বাঙালির চিরকালের গৌরব আর অযুত অহঙ্কারের দিন ২৬ মার্চ; বাঙালির জাতীয় জীবনের ইতিহাসে উজ্জ্বল, ভাস্বর এই দিন। দীর্ঘকালের পরাধীনতার গ্লানি আর বিজাতীয় শাসন-শোষণের যাঁতাকল থেকে মুক্তি ছিনিয়ে এনে বাঙালির আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করা হয়েছিল ১৯৭১ সালের এই দিনে।

দীর্ঘ পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছিল। তার আগে সাতই মার্চের বিশাল জনসভায় বাঙালি জাতির অবিসম্বাদিত নেতা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্পষ্টই ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। ২৫ মার্চ দিবাগত গভীর রাতে বঙ্গবন্ধু এক ওয়ারলেস বার্তায় জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপর দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে মুক্তিযুদ্ধ। এই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার-আল বদর-আল শামস বাহিনীর সদস্যদের অত্যাচার-নির্যাতন পৃথিবীর ইতিহাসের সকল বর্বরতাকে হার মানিয়েছিল। হায়েনার মতো তারা নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সারা দেশের মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তারা টিকতে পারেনি।

ইংরেজরা ১৯৪৭ সালের মধ্য আগস্ট জন্ম দেয় পাকিস্তান ও ভারত নামের দুটি রাষ্ট্র। ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া স্বাধীনতা বাঙালি জাতিকে সুখ-শান্তি তথা মুক্তি দেয়নি। নেমে আসে পাকিস্তানি দুঃশাসন, বঞ্চনা ও শোষণের খড়গ। পাকিস্তানের শতকরা ৫৫% বাঙালি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য ও শোষণের শিকার হয়েছে তারা। সেনাবাহিনীতে বাঙালিদের স্থন ছিল না বললেই চলে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন ছাড়াও পূর্ব বাংলা সরকারের প্রশাসনেও ছিল অবাঙালি আমলাদের প্রাধান্য। প্রথমেই তারা বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতি ধ্বংসের লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে একমাত্র উর্দুকে প্রতিষ্ঠিত করার ষড়যন্ত্র শুরু করে। আসলে পাকিস্তান রাষ্ট্র পূর্ব বাংলার মানুষের জন্য নতুনভাবে পরাধীনতার অভিশাপ বয়ে আনে। মূলত ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালিরা পরাধীন ছিল।
পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের যাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক, বাঙালিরা ফুঁসে ওঠে। শুরু হয় আন্দোলন। ধাপে ধাপে এগিয়ে চলে সে আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থন, ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় (১৬৯আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন লাভ) বাঙালিদের পৌঁছে দেয় তাদের স্বপ্নের গন্তব্যে।

১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকরা আওয়ামী লীগ নেতা, বাঙালির প্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে শুরু করে বহুমুখী ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালিরা মহাবিক্রমে জেগে ওঠে। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ সেদিন থেকে মুক্তিপাগল বাঙালিরা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি শুরু করে।

দীর্ঘ দুই যুগ পাকিস্তানি শোষণ, বঞ্চনা ও দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে স্তব্ধ করার উদ্দেশ্যে ২৫ মার্চ ১৯৭১ রাতে ঘুমন্ত-নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মারণাস্ত্রে সজ্জিত জেনারেল ইয়াহিয়া খানের রক্তলোলুপ পিশাচেরা। নির্বিচারে তারা হত্যা করে অগণিত মানুষকে। ইতিহাসের এই বর্বরতম গণহত্যা বাঙালিদের স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে জ্বলে ওঠে তারা।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত সাড়ে ১২টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হওয়ার অল্প সময় আগেই তাঁর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হয়ে যায় ইপিআরের ওয়্যারলেসযোগে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি ২৫ মার্চ রাত ১১টায় হাজি মোর্শেদ ঢাকার বলধা গার্ডেন থেকে এক গোপন রেডিও ট্রান্সমিটার থেকেও প্রচার করেন। তারপর ঢাকার মগবাজার টি অ্যান্ড টি অফিস থেকে গোপনে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি সমগ্র দেশে পাঠানো হয়। ২৫ মার্চ রাত ১২টা ১৫ মিনিটে স্বাধীনতা ঘোষণার ওয়্যারলেস মেসেজ চট্টগ্রামে পৌঁছায়। তারপর চট্রগ্রামের কালুরঘাটে স্থাপিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চ দুপুর ২টায় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা প্রথম প্রচার করেন চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতা তৎকালীন এম এন এ এম. এ. হান্নান। পরদিন ২৭ মার্চ, সন্ধ্যা ৭টায় ঐ বেতার কেন্দ্র থেকেই বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন তৎকালীন অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান।

ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘এটা হয়তো-বা আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি-আপনারা যে যেখানে আছেন এবং আপনাদের হাতে যার যা আছে তাই নিয়ে হানাদার বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বিতাড়িত না হওয়া এবং চূড়ান্তু বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্তু আপনাদের যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। খোদা হাফেজ-জয় বাংলা।’
বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা ঘোষণার এটাই প্রেক্ষাপট।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণায় ঘুরে দাঁড়ায় বাঙালি। ২৪ বছরের একটা অহিংস, গণতান্ত্রিক আন্দোলন সশস্ত্র সংগ্রামে রূপ নেয়। তারা সারা দেশে পাকিস্তানিদের নৃশংসতার বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অদম্য মনোবল আর বুকভরা সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়ায় অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীকে। তারপর দীর্ঘ ৯ মাসের মরণপণ যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্তু বিজয়। ঐতিহাসিক এই বিজয়ের গৌরব-গাথার পাশাপাশি স্বজন হারানোর বেদনা এবং শোকের বিস্তৃতিও পাহাড়সম। ৩০ লাখ বাঙালি শহীদ হলো, ৪ লাখেরও অধিক মা-বোন সম্ভ্রম হারালো। প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হলো। নৃশংস এইসব বর্বরতাও বাঙালিদের দমাতে পারেনি। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত মিত্রবাহিনীর কাছে ১ লাখ সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল এ. কে. নিয়াজী। এমনি করেই শেষ পর্যন্তু অভ্যুদয় ঘটলো স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

তিরিশ লাখ শহীদের রক্ত এবং বহু ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর আমরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিলাম। আজকের এই দিনে স্বাধীনতাযুদ্ধের সকল শহীদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং যাঁরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের সবাইকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি, মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা প্রদানকারী সকল ব্যক্তিকে। অন্যদিকে, আমরা ঘৃণা জানাচ্ছি পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতাকারী এই দেশেরই কিছু কুসন্তানকে। স্বাধীনতার ৫৩তম দিবসে স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী মানবাধিকারকর্মী, লেখক ও সাংবাদিক
nazrul@gmx.at

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights