বাণিজ্যিক রাজধানীর যত সমস্যা

মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম

দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম। পাহাড়, নদী ও সমুদ্রবেষ্টিত অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই নগরী দেশের মোট রাজস্বের সিংহভাগ জোগান দিলেও, বিনিময়ে পেয়েছে শুধুই বঞ্চনা। দশকের পর দশক ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর চরম সমন্বয়হীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে চট্টগ্রামের প্রায় ৬০ লাখ বাসিন্দার প্রাত্যহিক জীবন এখন এক চরম দুর্ভোগের নাম। সংশ্লিষ্টদের মতে- সঠিক পরিকল্পনা, প্রকল্প প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অদূরদর্শিতার অভাবে দেশের বাণিজ্য রাজধানী বঞ্চিত হয়েছে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন থেকে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কারণে বন্দর নগরীতে পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। একটি পরিকল্পিত নগরী গড়তে সিডিএ, ওয়াসাসহ অন্য সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয় করে কাজ করছে বর্তমান সরকার। কাজের সমন্বয় করতে একটি সমন্বিত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর চট্টগ্রাম জেলার সম্পাদক অ্যাডভোকেট আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রামকে সত্যিকারের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলছে কোনো সরকারই কাজ করেনি। হয়নি সঠিক পরিকল্পনা ও প্রকল্প প্রণয়ন। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে চট্টগ্রামের মূল সমস্যাগুলো সমাধান জরুরি। কারণ চট্টগ্রাম না এগোলে দেশ এগোতে পারবে না।’

চট্টগ্রামের সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার নাম জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুম তো বটেই, জোয়ারের পানি বা সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। জলাবদ্ধতা নিরসনে গত কয়েক বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বাস্তবে এর কোনো সুফল মিলছে না। খাল ও নালাগুলো দখল এবং ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। নগরবাসীর আরেক নিত্যদিনের সঙ্গী নাম যানজট। সংকীর্ণ রাস্তা, যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং গণপরিবহনে চরম বিশৃঙ্খলার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে থাকতে হয় সাধারণ মানুষকে। এ ছাড়া ওয়াসা, গ্যাস কর্তৃপক্ষের খোঁড়াখুঁড়িতে সারা বছরই রাস্তাঘাট থাকে বেহাল। বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়ায় পাহাড় ধস। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য করছে। এসব ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে প্রতি বছরই পাহাড় ধসে প্রাণহানি ঘটছে। প্রশাসন মাঝে মাঝে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালালেও স্থায়ী কোনো সমাধান হচ্ছে না। পাহাড় খেকোদের দৌরাত্ম্যে চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে। চট্টগ্রামের লাইফলাইন কর্ণফুলী নদী আজ ভয়াবহ দূষণের শিকার। শিল্পকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য, পলিথিন এবং গৃহস্থালি বর্জ্যে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ দখলদাররা নদীর তীর দখল করে গড়ে তুলেছে অসংখ্য স্থাপনা। নদীর নাব্য কমার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং দেশীয় অর্থনীতিও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়ছে। জনসংখ্যার এই নগরীতে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট রয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ সরকারি হাসপাতালগুলোতে শয্যা, ওষুধ ও চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অন্যদিকে, ওয়াসার পানি সরবরাহ এখনো অনেক এলাকায় অপর্যাপ্ত এবং অনেক ক্ষেত্রে পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের এই দুরবস্থার পেছনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো সেবাদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), ওয়াসা এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের মধ্যে কাজের কোনো সমন্বয় নেই। এক সংস্থা রাস্তা মেরামত করে তো পরদিনই আরেক সংস্থা পাইপ বসানোর জন্য তা খুঁড়ে ফেলে। যদিও সব সংস্থার সমন্বয় করতে একটি কমিটি গঠন করেছে সরকার। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বিগত সময়ে সেবা খাতগুলো নিজেদের ইচ্ছেমতো কাজ করছে। ফলে চট্টগ্রামে পরিকল্পিত উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, ওয়াসাসহ অন্য সংস্থাগুলো সমন্বয় করে কাজ করছে। আশা করি সমন্বিত এ কাজের ফল পাবেন নগরবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights