বাব আল-মানদেবেও সংকট, চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশের বাণিজ্য
অনলাইন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালির পর এবার ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় বাব আল-মানদেব প্রণালি নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপগামী পণ্যবাহী জাহাজকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে হলে পরিবহন সময় ও খরচ দুটিই বাড়বে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, লোহিত সাগরের রুট এড়িয়ে কেপ অব গুড হোপ হয়ে ইউরোপে যেতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে পণ্য পৌঁছাতে ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত বেশি সময় লাগতে পারে। জ্বালানি ও বিমা খরচ বাড়লে জাহাজ ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সাবেক সভাপতি কবির আহমেদ খান বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপে বাংলাদেশের পণ্য পৌঁছাতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ দিন সময় লাগতে পারে। ফুয়েল চার্জ, জাহাজের বিমা ও অন্যান্য খরচ যোগ হলে ফ্রেইট ভাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, লোহিত সাগর ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ। এই পথ ব্যাহত হলে সময় ও পরিবহন খরচ দুটিই বাড়বে। হরমুজের পাশাপাশি লোহিত সাগরের পথও সংকটে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাড়তি চাপ ছোট রপ্তানিকারকদের
ফ্রেইট খরচ বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন ছোট ও মাঝারি পোশাক রপ্তানিকারকরা। সাধারণত এফওবি ভিত্তিক রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক ফ্রেইটের মূল খরচ বিদেশি ক্রেতারা বহন করেন। তবে লজিস্টিকস ব্যয় বেড়ে গেলে এর একটি অংশ সরবরাহকারীদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতে পারেন ক্রেতারা।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ইনামুল হক খান বাবলু বলেন, শিপিং ভাড়া বাড়লে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়তে পারে। অর্ডার হারানোর আশঙ্কায় অনেককে বাড়তি লজিস্টিকস খরচের অংশ নিজেদের বহন করতে হতে পারে।
বিশেষ করে ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড (এলডিপি) পদ্ধতিতে রপ্তানিকারকদের ঝুঁকি বেশি। এ ব্যবস্থায় ক্রেতার গুদাম পর্যন্ত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার পুরো দায়িত্ব ও খরচ রপ্তানিকারকের। বিজিএমইএর হিসাবে, বাংলাদেশের ৫ থেকে ১০ শতাংশ চালান এ পদ্ধতিতে রপ্তানি হয়।
জ্বালানি নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ
হরমুজ ও বাব আল-মানদেব- দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির খরচেও।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম তামিম বলেন, পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বাংলাদেশকে দ্রুত জ্বালানি তেল, বিশেষ করে ডিজেলের মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। তাঁর মতে, প্রধান তেল পরিবহন পথগুলো একসঙ্গে বাধাগ্রস্ত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
সাম্প্রতিক বাজারদরেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গত শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৪.৬১ ডলারে উঠেছে, যা এক মাস আগে ছিল ৮৭.০৭ ডলার। বাংলাদেশের আমদানির অন্যতম অপরিশোধিত তেল মুরবান ক্রুডের দামও এক মাসে ৮২.২৫ ডলার থেকে বেড়ে ১১৯.৪৬ ডলারে পৌঁছেছে। এশীয় এলএনজি বেঞ্চমার্ক জাপান-কোরিয়া মার্কারের (জেকেএম) দামও প্রতি এমএমবিটিইউ ২৪.৮২ ডলারে উঠেছে।
২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর হুথিদের হামলার কারণে লোহিত সাগরের নিরাপত্তা নিয়ে সংকট তৈরি হয়েছিল। এরপর থেকেই অনেক মেইনলাইন অপারেটর (এমএলও) লোহিত সাগর এড়িয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করছে। নতুন করে সংঘাত বাড়লে সেই বিকল্প পথের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বাফার সাবেক সহ-সভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, লোহিত সাগরের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন। তবে এখন পর্যন্ত মেইনলাইন অপারেটরদের পক্ষ থেকে ফ্রেইট ভাড়া বাড়ানো বা জাহাজের সময়সূচি পরিবর্তনের কোনো আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাওয়া যায়নি।
এদিকে আন্তর্জাতিক কনটেইনার ও লজিস্টিকস তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সোজেসের সেপ্টেম্বরের ইউরোপ কনটেইনার মার্কেট আপডেট অনুযায়ী, উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে চলাচলের কারণে বৈশ্বিক কনটেইনার সক্ষমতার প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ পথে আটকে থাকছে। এর পরিমাণ প্রায় ১৭ লাখ থেকে ২৪ লাখ টিইইউএস কনটেইনারের সমান।
ফলে হরমুজের পর বাব আল-মান্দেবেও যদি বড় ধরনের বাধা তৈরি হয়, তাহলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তথ্য সূত্র- টিবিএস।
