বিক্ষোভে অচল পাকিস্তান কাশ্মীর, রাজপথে আজাদী ও অধিকারের চূড়ান্ত লড়াই
অনলাইন ডেস্ক
টানা ২৬ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা তীব্র অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল ও সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পাকিস্তান অধ্যুষিত কাশ্মির (আজাদ কাশ্মির)। ৩৮ দফা দাবিতে চলমান এই গণআন্দোলন দমাতে পাকিস্তান সরকার কঠোর দমননীতি গ্রহণ করেছে। গত জুনের শুরু থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে দফায় দফায় সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ২০ থেকে ২৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, যার মধ্যে ৪ জন নিরাপত্তা কর্মীও রয়েছেন। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, মৃতের সংখ্যা ৩২ ছাড়িয়েছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই গত ৩০ জুন আন্দোলনের শীর্ষ নেতা শওকত নওয়াজ মীর-কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
আন্দোলনের পটভূমি
নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং বিদ্যুৎ বিলে ভর্তুকির দাবিতে ২০২৩ সালের মে মাসে এই আন্দোলনের সূত্রপাত। বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে গঠিত ‘জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি’ (JAAC) নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেও তীব্র শাটডাউন কর্মসূচির মাধ্যমে কাশ্মিরে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। তখন সরকারের সাথে একটি চুক্তি হলেও তা বাস্তবায়ন না করার প্রতিবাদে গত ৯ জুন থেকে শুরু হয় আন্দোলনের নতুন ও চূড়ান্ত পর্যায়। এর আগে, গত ৫ জুন পাকিস্তান সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এই আন্দোলনকারী সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং শীর্ষ ৪ নেতার মাথার দাম ১ কোটি (১০ মিলিয়ন) রুপি ঘোষণা করে।
এবারের আন্দোলনে দলমত নির্বিশেষে নারী ও স্কুল শিশুসহ সর্বস্তরের লাখো মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে। আন্দোলনকারীদের মুখে স্লোগান উঠছে—‘পাকিস্তানি বাহিনী দূর হটো’, ‘আমরা মৌলিক অধিকার চাই’, ‘আমাদের বিদ্যুৎ আমাদের দাও’। অ্যাকশন কমিটির নেতারা ইসলামাবাদের তীব্র বৈষম্যের ইতিহাস তুলে ধরে বাঙালি, বেলুচ ও পশতুদের সাথে পাকিস্তানের আচরণের উদাহরণ দিচ্ছেন। দাবি না মানলে তারা সরকারকে দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাজধানী মুজাফফরাবাদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়েছেন।
সংকটের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ ও সংরক্ষিত আসন
বিক্ষোভকারীদের প্রধান ক্ষোভ হলো—কাশ্মিরে উৎপাদিত সস্তা জলবিদ্যুৎ স্থানীয়দের চড়া দামে কিনতে হচ্ছে, অথচ পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের মানুষ ও আমলারা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন। এর পাশাপাশি আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় কাশ্মির বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিধানসভায় কাশ্মিরের বাইরে (পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে) থাকা শরণার্থীদের জন্য ১২টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই ১২টি আসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ইসলামাবাদ কাশ্মিরের ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। তারা এই সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাতিলের দাবিতে অনড়। সম্প্রতি কাশ্মিরের সর্বোচ্চ আদালত এই আসন বাতিলের জন্য সাংবিধানিক সংশোধনীর কথা বললে আন্দোলন আরও বেগবান হয়।
তীব্র মানবিক সংকট ও বিচ্ছিন্ন উপত্যকা
অ্যাকশন কমিটির শাটডাউন ও লংমার্চ কর্মসূচির কারণে মুজাফফরাবাদ, রাওয়ালকোট ও মিরপুরসহ প্রধান শহরগুলোর সমস্ত দোকানপাট, কাঁচাবাজার ও পরিবহন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। আন্দোলন রুখতে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় ব্যাংকিং এবং এটিএম সেবা অচল হয়ে পড়েছে। কারফিউ এবং কঠোর মিডিয়া সেন্সরশিপের কারণে উপত্যকাটি এখন বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন। ফলে খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা অঞ্চলটিতে বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি এক বিশাল সমাবেশে কাশ্মিরি নেতা সরদার আমান খান স্পষ্ট ভাষায় হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, “পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির কখনোই পাকিস্তানের সাংবিধানিক অংশ ছিল না। আমাদের চেয়ে পাকিস্তানেরই এই অঞ্চলের বেশি প্রয়োজন।”
আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ কাড়তে বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী কাশ্মিরিরাও পাকিস্তান দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ শুরু করেছেন। সরকারের শীর্ষ নেতা গ্রেফতার ও অনড় অবস্থানের বিপরীতে কাশ্মিরি জনগণের এই ঐতিহাসিক প্রতিরোধ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে ক্রমশ আলগা করে দিচ্ছে।
