বিশ্বায়ন বনাম মেহনতি মানুষের অধিকার

ফাইজুস সালেহীন
শ্রম ও শ্রমের মর্যাদা এবং প্রাসঙ্গিকতা চিরকালীন। বছর ঘুরে মে দিবস এলে আমাদের চেতনায় শ্রমভাবনা নতুন জীবন পায়। এই আনুষ্ঠানিকতা অপ্রয়োজনীয় নয়। মে দিবস শুধু একটি স্মরণ দিবস নয়; এটি আধুনিক রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ ও বিশ্বপল্লি বা গ্লোবালাইজেশনের সম্পর্ক বোঝার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা। উনিশ শতকের শেষ ভাগে শিল্পবিপ্লব-উত্তর বিশ্বে শ্রমিকদের অবস্থান ছিল প্রতিকারহীন অসহায়ত্ব। অনির্ধারিত কর্মঘণ্টা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অপ্রতুল মজুরি ছিল সেই সময়ের শ্রমজীবী মানুষের জীবনের অলঙ্ঘনীয় বাস্তবতা। এই অসহনীয় বাস্তবতার বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম, তারই প্রতীক ১ মে-মে দিবস।

১৮৮৬ সালের ১ মে, শিকাগোর লক্ষাধিক শ্রমিক আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে ধর্মঘটে গেলে চার দিনের মাথায় হে মার্কেটে পুলিশের গুলিতে বিদীর্ণ হয় মেহনতি শ্রমিকের বক্ষ। রচিত হয় ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়। এখন থেকে ১৪০ বছর আগে যে পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার একটি শহরে রক্তের অক্ষরে মেহনতি মানুষের সংগ্রামের ইতিহাস লেখা হয়েছিল, আজকের দিনে সেই বাস্তবতার কী ধরনের পরিবর্তন-রূপান্তর ঘটেছে, সেটা গভীর এক চিন্তার বিষয়।

৫০-৬০ বছর আগে শ্রমিকের সমস্যা এবং বর্তমানের সমস্যা একরকম নয়। বিশ্বজুড়ে শ্রমের চাহিদা বেড়েছে। শ্রম বিনিয়োগের ক্ষেত্র পরিবর্তিত হয়েছে। বৈচিত্র্য এসেছে কর্মজগতের। কর্মসংস্থানের বহুমুখী সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আশি-নব্বই দশকে বিশ্বায়নের ধারণা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করলে শ্রম-বিশ্বায়নের ক্ষেত্র তৈরি হয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক শ্রমের বাজারে প্রথাগত মাসোহারাভিত্তিক শ্রম কেনাবেচার বাইরে প্রসার ঘটে গিগ-ইকোনমির। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি একটি মাত্র কাজের ওপর নির্ভর না করে বিবিধ কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। যখন যে কাজ সুবিধাজনক মনে করছেন সেটাই করে ‘শুধু দিন যাপনের, শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি’ মোচন করে চলেছেন। এই শ্রেণির শ্রমিকের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। তাঁদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই।

তাঁরা সময় ও সুযোগের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের ধরাবাঁধা কোনো আয়ও নেই। এঁদের কেউ কেউ খুব ভালো জীবনযাপন করেন, কেউ কেউ কষ্টেসৃষ্টে চলেন।

সরকারি চাকরিতেও একালে অনেক ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তা নেই। বেসরকারি খাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চাকরির নিরাপত্তার প্রশ্নটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে। শ্রমশোষণ-সহায়ক পণ্ডিতরা আবিষ্কার করেছেন আউটসোর্সিং ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের তত্ত্ব। এতে নাকি সরকারের অনেক টাকা বাঁচে, বাণিজ্য ফুলেফেঁপে ওঠারও সম্ভাবনা। একই কাজ করা সত্ত্বেও একজন নিয়মিত কর্মচারী যে বেতনভাতা পান, একজন আউটসোর্সের কর্মচারী তার চেয়ে অনেক কম পান। ঈদ-পার্বণে তাঁর (আউটসোর্সকর্মীর) কোনো ভাতা নেই। বছর শেষে কোনো ইনক্রিমেন্টও নেই। ওই কর্মচারী কাজ করেন সরকারের, সামান্য যা বেতন পান; তা-ও সরকারই দেয়। মাঝখান থেকে লাভ খান ঠিকাদার। এটা হচ্ছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা লোপাটের একটি নিকৃষ্ট পন্থা। একই পন্থায় এই লোপাটকারীরা বিভিন্ন কোম্পানির কর্মীদের প্রকৃত মজুরিতেও ভাগ বসান। এঁরা বিভিন্ন কোম্পানিতে সস্তায় কর্মী সরবরাহ করেন। ততোধিক সস্তায় কর্মী নিয়োগ করেন।

এগুলো হচ্ছে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে শ্রমশোষণের সামান্য কিছু নমুনা। বিশ্বায়নের এই যুগে স্বল্পোন্নত এবং অনুন্নত দেশসমূহের শ্রমজীবী ও কর্মজীবী মানুষ বহির্বিশ্বের শ্রমবাজারে যে বৈষম্য, বিড়ম্বনা, শোষণ ও জুলুমের শিকার হয়ে চলেছেন তা-ও সভ্যতার নামে এক নির্দয় পরিহাস বৈ কিছু নয়। এই জায়গাটায় আন্তর্জাতিক সমাজে কোনো রাঁ নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কিংবা মানবাধিকার সংস্থা বলতে গেলে নীরব। গ্লোবালাইজেশনের সুবাদে বিশ্ববাণিজ্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক সহজ হয়েছে। বিদেশে বিনিয়োগ সহজ হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সহজেই বিশ্বব্যাপী তাদের বাণিজ্যের প্রসার করে চলেছে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে কারখানা স্থানান্তর করতেও কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। কিন্তু শ্রমশক্তির যাতায়াত এখনো অবাধ নয়।

যদি বাংলাদেশের কথাই বলি, তাহলে কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে কত পরিবার যে সর্বস্ব খুইয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সত্য বটে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধান খাত এখন প্রবাসী শ্রমশক্তি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মজীবী নারী ও পুরুষের সংখ্যার সঠিক হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে অনুমান করা হয় গড়ে এক কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশে রয়েছেন। তাঁরা ওই সব দেশের উন্নয়নে অবদান রেখে চলেছেন। এই প্রবাসী শ্রমশক্তির মাধ্যমে দেশে প্রতি বছর ২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রা এসে থাকে। দেশের অর্থনীতিতে এই আয় বড় ভূমিকা রাখছে। যেসব পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য বিদেশে আছেন, সেসব পরিবারের বেশির ভাগই এখন অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল। তাঁদের বাড়িঘরে জলুস এসেছে। অনেক পরিবার প্রবাসী স্বজনের পাঠানো টাকা বিনিয়োগ করে উন্নত জীবন নিশ্চিত করেছে।

কিন্তু যাঁরা বিদেশবিভুঁইয়ে আছেন, তাঁদের কত ভাগ মানসম্মত জীবনযাপন করছেন? সাধারণ কর্মীদের বেশির ভাগই বিদেশে কষ্টকর জীবনযাপন করেন। তাঁরা নানান রকম জুলুমের শিকার হন। তাঁরা যে মজুরি পান, তা-ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর স্বজনপরিজন ছেড়ে দূর প্রবাসে ও প্রতিকূল কর্মপরিবেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে মজুরি তাঁরা পান, তার বড় একটা অংশ দেশে পাঠিয়ে দেন পরিবারের জন্য। এই চিত্রটি হলো মন্দের ভালো। পাশাপাশি রয়েছে নিষ্ঠুর প্রতারণার ইতিবৃত্তান্ত। দেশে বা বিদেশে এই অতিমূল্যবান শ্রমজীবীদের কোথাও কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই। যেসব দেশে তাঁরা যান সেসব দেশে তাঁদের না আছে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, না আছে কোনো বার্গেনিং এজেন্ট। অথচ যাঁরা জনশক্তি রপ্তানি করেন, তাঁরা সংঘবদ্ধ, তাঁদের সমিতি রয়েছে।

স্বপ্ন, প্রতারণা ও অসহায় মৃত্যুর আরেক বাস্তবতা হলো অবৈধপথে ইউরোপ যাত্রা। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার কর্মপ্রত্যাশী মানুষ সমুদ্রপথে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁরা শিকার হন অপঘাত মৃত্যুর। ইউরোপ-দক্ষিণ এশিয়ার বহু বেকার বা আধা বেকার যুবকের কাছে এখনো এক স্বপ্নের নাম। উন্নত জীবন, উচ্চ আয়ের চাকরি, সামাজিক নিরাপত্তা-সব মিলিয়ে যেন এক স্বর্গের হাতছানি। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনে যে অন্ধকার বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। অবৈধ পথে ইউরোপে যাওয়ার প্রবণতা আজ শুধু একটি অভিবাসন ইস্যু নয়; এটি এক নীরব মানবিক বিপর্যয়, যেখানে প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নতুন মৃত্যু, নতুন নিখোঁজের তালিকা। কিন্তু এই স্বপ্নের দরজায় প্রথম যে শক্তি কাজ করে, তাহলো দালাল চক্র। তারা ইউরোপকে এমনভাবে উপস্থাপন করে, যেন সেটি হাতের নাগালে। কয়েক লাখ টাকা দিলেই ‘ব্যবস্থা’ হয়ে যাবে, এই মিথ্যা আশ্বাসই অনেককে ঠেলে দেয় অজানা এক যাত্রায়।

২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অভিবাসনপথে মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে ৭০ হাজারের বেশি মানুষ। এর মধ্যে ইউরোপগামী ভূমধ্যসাগর রুটে ৩০ হাজারের বেশি প্রাণহানি ঘটেছে। বলা হয়ে থাকে ভূমধ্যসাগর হলো আধুনিক যুগের গণসলিল সমাধিক্ষেত্র।

উত্তর আফ্রিকার লিবিয়া বা তুরস্ক থেকে যাত্রা শুরু করে যাঁরা ইউরোপের ইতালি বা গ্রিসে পৌঁছতে চান, তাঁদের অনেকেই মাঝপথে হারিয়ে যান। কেউ ডুবে যান, কেউ ভেসে থাকেন দিনের পর দিন, কেউবা নিখোঁজ হয়ে যান চিরতরে।

অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়, পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। কেউ কেউ বাধ্য হন শ্রমদাস হিসেবে কাজ করতে। এগুলো নিঃসন্দেহে শ্রমসংকট যা মে দিবস তথা শ্রমিকের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

দেশে ও বিদেশে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের যে বহুমাত্রিক সমস্যা, তা বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমসংকট, শ্রমবিরোধ এবং কর্মপরিবেশের উন্নয়নে ওই দেশের সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। বিষয়টি বহুলাংশে নির্ভর করে সরকারের সদিচ্ছা ও দক্ষতার ওপর। কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে সমস্যাটিকে অ্যাড্রেস করতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। বিশ্বব্যাপী শ্রমশক্তির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার পথে জটিলতাগুলো কারা সৃষ্টি করছে? কর্মপ্রত্যাশী মানুষকে টার্গেট করে কারা ভিসা ও ওয়ার্কপারমিট বিক্রির নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে? এই প্রশ্নগুলো সামনে আনা দরকার। কর্মজীবী মানুষ যাঁরা বিদেশে গিয়ে কাজ করেন, তাঁরা বিদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রত্যক্ষ অবদান রাখেন। বিষয়টি কোনোমতেই একপাক্ষিক স্বার্থের নয়। ধনাঢ্য মধ্যপ্রাচ্য কিংবা উন্নত ইউরোপ-আমেরিকার উন্নতির পেছনে রয়েছে আফ্রো-এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার কর্মজীবী মানুষের শ্রম, মেধা ও ঘাম। তা সত্ত্বেও দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে প্রস্তুত নয়। তাদের মনোভাব এমন যে, তারা কেবল দয়াই করে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের কাছে যেন তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। এই দ্বিচারিতার অবসান দরকার। এজন্য বিশ্ব ফোরামে স্বল্পোন্নত বিশ্বের উচ্চকিত হওয়া উচিত। ইস্যুগুলো আজ হোক, কাল হোক অবশ্যই সামনে আসবে। নীরবতা ভাঙতে হবে।

♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights