বিশ্ব টুনা দিবস ২০২৬: বঙ্গোপসাগরের গভীরে বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন

আশিক উল বারাত

কুয়াকাটার জেলে ছত্তার মাঝি ২৫ বছর ধরে সমুদ্রে মাছ ধরেন। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার জালে উঠে আসে সাড়ে ১৮ কেজির একটি বিশাল টুনা মাছ। মহিপুর মৎস্যবন্দরের আড়তে তা দেখতে ভিড় করেন উৎসুক মানুষ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছিলেন, এই এলাকায় এত বড় টুনা আগে কখনো দেখেননি তারা। ছত্তার মাঝি নিজেও অবাক। ২৫ বছরে সর্বোচ্চ ৫ থেকে ৭ কেজির টুনা পেয়েছিলেন, এবারেরটা যেন অন্য দুনিয়ার মাছ।

এই একটা ঘটনাই বলে দেয়, বঙ্গোপসাগরের গভীরে কী বিশাল সম্পদ লুকিয়ে আছে। আর প্রতি বছর ২ মে পালিত বিশ্ব টুনা দিবসে সেই সম্পদকে কাজে লাগানোর প্রশ্নটা আরও জরুরি হয়ে ওঠে।

বঙ্গোপসাগরে আছে টুনার ৮টি প্রজাতি
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বিস্তৃত ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে। মৎস্য অধিদফতরের তথ্য বলছে, এই বিশাল এলাকায় রয়েছে ইয়েলোফিন টুনা ও স্কিপজ্যাক টুনাসহ ৮টি প্রজাতির টুনা মাছ। অথচ এখন পর্যন্ত মোট এলাকার মাত্র ১ শতাংশেরও কম থেকে মৎস্য সম্পদ আহরণ করা সম্ভব হচ্ছে। বছরে গড়ে ৬ দশমিক ৫ লাখ টন মাছ পাওয়া যাচ্ছে সেখান থেকে।

পাইলট প্রকল্পে শুরু হয়েছে টুনা আহরণ
এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে মৎস্য অধিদফতর ২০২৪ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পাইলট প্রকল্প শুরু করেছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৫ কোটি ২১ লাখ টাকা। চীন থেকে কেনা দুটি জাহাজে ৩০ জন ক্রু নিয়ে স্থলভাগ থেকে প্রায় ৩৮০ নটিক্যাল মাইল দূরে, ২০০ মিটার গভীর সমুদ্রে এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় টুনা আহরণ করা হচ্ছে।

মৎস্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার বলেন, আমরা যদি টেকসইভাবে টুনা আহরণ ও সংরক্ষণ করতে পারি, তাহলে আমাদের কাছে সমুদ্রের বিশাল মাছের উৎপাদনের ক্ষেত্র উদঘাটন হবে।

টুনা কেন খাবেন, জানুন উপকারিতা
টুনা শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও অসাধারণ। এতে রয়েছে প্রচুর ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করে। উচ্চমাত্রার প্রোটিন, ভিটামিন বি ১২, খনিজ পদার্থ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। চর্বি কম বলে ওজন নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর। বাংলাদেশে যেখানে পুষ্টিহীনতা এখনো একটি বড় সমস্যা, সেখানে টুনা হতে পারে সহজলভ্য পুষ্টির বড় উৎস।

বিশ্বে কী হচ্ছে
বিশ্বের মোট বন্য টুনা আহরণের ৫৪ শতাংশ এখন মেরিন স্টুয়ার্ডশিপ কাউন্সিলের টেকসই মানদণ্ড মেনে হচ্ছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৭৫ শতাংশ টুনা আহরণ হতো স্বাস্থ্যকর মজুদ থেকে, আজ সেই সংখ্যা ৯৯ শতাংশে পৌঁছেছে। ২৩টি টুনা মজুদের মধ্যে মাত্র ২টিতে এখনো অতিরিক্ত আহরণ চলছে। জাতিসংঘের এফএওর লক্ষ্য ২০২৭ সালের মধ্যে সব প্রধান টুনা মজুদকে টেকসই মাত্রায় আনা।

সতর্কতাও জরুরি
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টুনার প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং তারা আরও গভীর সমুদ্রে সরে যাচ্ছে। বড় টুনা মাছ সাধারণত সমুদ্রের গভীরে চলাফেরা করে। দলছুট হয়ে উপকূলের কাছে এলেই জেলেদের জালে পড়ে। তাই গভীর সমুদ্রে টেকসই আহরণের পরিকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

বিশ্ব টুনা দিবসের এই দিনে বাংলাদেশের সামনে সুযোগটা স্পষ্ট। বঙ্গোপসাগরের গভীরে যে সম্পদ অপেক্ষা করছে, তাকে টেকসইভাবে কাজে লাগাতে পারলে নীল অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বাংলাদেশের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights