বুধবার চীন সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ এবং এর জেরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে চীন সফরে যাচ্ছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

বুধবার তিনি বেইজিংয়ে পৌঁছে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

চীনের রাজধানীতে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বৈঠক এমন এক সময়ে হতে যাচ্ছে, যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে উদ্বেগ বাড়ছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় এবং ইরান ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। চলমান যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে বেইজিংও। ফলে আরাগচির এই সফরকে ইরান-চীন কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওয়াং ই ও আরাগচি বুধবার বেইজিংয়ে বৈঠকে বসবেন। দুই মন্ত্রীর সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল গত জুলাইয়ে।

চলমান সংঘাতের পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এর আগে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনেও অংশ নিয়েছিলেন ওয়াং ই ও আরাগচি। সম্মেলনের ফাঁকে তাদের দু’জনকে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য কথোপকথন করতেও দেখা যায়।

ব্রিকস সম্মেলনের পরপরই আরাগচির বেইজিং সফর হওয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে চীন ও ইরানের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও জোরদার হচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা চীনের
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত বন্ধে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে চীন। বেইজিং একদিকে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে চলছে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

চীনের জন্য ইরান-ইসরায়েল ও ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব শুধু রাজনৈতিক নয়, অর্থনৈতিকও। কারণ চীন ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে।
ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে চীনের অর্থনীতিতেও তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

হরমুজ অবরোধে বাড়ছে অর্থনৈতিক উদ্বেগ
চলমান সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই জলপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।

ইরানের হরমুজ অবরোধ এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর ফলে তেলের সরবরাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেলের দাম বাড়লে তা শুধু আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর চাপ তৈরি করবে না, বরং পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ ও খাদ্যসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতেও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটের প্রভাব দেশটির অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি ব্যাহত হলে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হবে বেইজিংকে।

ইরানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ চীন
ইরানের দিক থেকেও চীন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সীমিত হয়ে পড়লেও চীনের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্যিক ও জ্বালানি সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।

তাই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে তেহরানের জন্য।

আরাগচির সফরে যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ, জ্বালানি সরবরাহ এবং সংঘাতের কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একই সঙ্গে ইরান চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন চাইতে পারে। অন্যদিকে চীন সংঘাত যাতে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে।

সংঘাত দীর্ঘ হলে বাড়বে বৈশ্বিক চাপ
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়ছে। যুদ্ধের প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তেল সরবরাহ, সমুদ্রপথ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক বাজারেও এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে। চীন ছাড়াও জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলোও সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আরাগচি-ওয়াং ই বৈঠককে শুধু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে চলমান যুদ্ধের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা সফল হবে এবং বেইজিং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights