বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, ২০ বছর ধরে দুর্ভোগে অর্ধশতাধিক পরিবার

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই জমে থাকে পানি, আর ভারী বর্ষণে শোবার ঘর, রান্নাঘর, ওয়াশরুম, বাথরুম—সবখানেই ঢুকে পড়ে পানি। কোথাও ছয় মাস, কোথাও আবার নয় মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয় এই জলাবদ্ধতা। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কুষ্টিয়ার প্রথম শ্রেণির কুমারখালী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের দুর্গাপুর গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক পরিবার।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত পৌরকর পরিশোধ করলেও গত প্রায় ২০ বছরেও পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা করেনি পৌর কর্তৃপক্ষ। বছরের ছয় থেকে নয় মাস হাঁটুসমান পানিতে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে। দ্রুত জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদের প্রধান ফটকের সামনে নির্মাণাধীন একটি পাকা ড্রেন রয়েছে। তবে সেখানে পানি জমে থাকলেও কোনো প্রবাহ নেই। ওই ড্রেন থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে দুর্গাপুর গ্রামের একাংশে পাকা ও আধাপাকা মিলিয়ে অর্ধশতাধিক বাড়ি রয়েছে। বাসিন্দাদের চলাচলের জন্য নির্মিত আরসিসি ঢালাই সড়কটিও পানির নিচে তলিয়ে গেছে। শোবার ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, ওয়াশরুম, এমনকি গোয়ালঘরেও থৈথৈ পানি। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। কেউ কেউ ঘরের পানি সেচে বাইরে ফেলছেন। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অনেক পরিবারের চুলায় আগুনও জ্বলেনি।

বয়োজ্যেষ্ঠ মো. শাজাহান আলী আক্ষেপ করে বলেন, সব ঘরে পানি। ইউএনও সাহেবের অফিসের একেবারে সামনে এই অবস্থা, কিন্তু কেউ খোঁজ নেয় না। আমরা সাহায্য চাই না, শুধু সুস্থভাবে বাঁচতে চাই। নিয়মিত কর দিই, অথচ পৌরসভা পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা করে না।

তার স্ত্রী নুরজাহান খাতুন বলেন, বছরের ছয় মাস পানি জমে থাকে। একটানা বৃষ্টিতে রান্নাঘর, গোয়ালঘর সব ডুবে গেছে। রান্না করতে পারিনি। কেউ এসে দেখেও না। দ্রুত পানি বের করার ব্যবস্থা করা হোক।

দুর্ভোগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ব্যবসায়ী রাজিব হোসেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, অনেক বছর পর ড্রেন হয়েছে, কিন্তু পানি যাচ্ছে না। হাঁটুসমান পানি জমে আছে। পানিতে দূষণ ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ছোট শিশুদের চলাচলে খুব কষ্ট হচ্ছে। ঘা-পাঁচড়াসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দিচ্ছে। সত্যিই খুব কষ্টে আছি।

বৃদ্ধ সুফিয়া খাতুন বলেন, শ্বশুরের আমল থেকে এখানে আছি। ভোটের সময় নেতারা অনেক প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু পরে আর কেউ আসে না। ছেলেরা কোনোভাবে বাইরে যেতে পারে, কিন্তু মেয়েরা টয়লেটে যাবে কীভাবে? দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জানা গেছে, গড়াই নদীর তীরঘেঁষে ১৮৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কুমারখালী পৌরসভায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের বসবাস। দীর্ঘদিন পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সড়কের অভাব ছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ধাপে ধাপে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ড্রেন ও পাকা সড়ক নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় পৌর কর্তৃপক্ষ। তবে এক বছরের মেয়াদের কাজ দুই বছরেও শেষ হয়নি।

এদিকে নিম্নচাপের প্রভাবে গত শনিবার বিকেল ৩টা থেকে রোববার বিকেল ৩টা পর্যন্ত কুমারখালীতে ৮৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছেন কুমারখালী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ। এর ফলে পৌরসভার ১, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

এ ছাড়া রোববার দুপুর ১২টা থেকে সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ৭২ ঘণ্টায়ও বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।

সরেজমিনে আরও দেখা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সড়ক, উপজেলা পরিষদের প্রবেশপথ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় এবং সমাজসেবা কার্যালয়ের সামনের সড়কেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। উপজেলা পরিষদ মাঠেও হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে।

কেন্দ্রীয় যুব অধিকার পরিষদের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও পৌরবাসী শাকিল আহমেদ তিয়াস বলেন, ড্রেন নির্মাণকাজে চরম ধীরগতি রয়েছে। ফলে এবারও ১, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কয়েকশ বাড়িতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে কুমারখালী পৌর প্রশাসক ও ইউএনও ফারজানা আখতার বলেন, জনবল সংকট, স্থানসংক্রান্ত জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে ড্রেন নির্মাণকাজে কিছুটা ধীরগতি হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, বর্তমান জলাবদ্ধতা নিরসনে পৌর কর্তৃপক্ষ কাজ করছে এবং দ্রুতই জমে থাকা পানি নেমে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights