বেরিয়ে এলো জর্ডানে মার্কিন বিমানঘাঁটিতে আইআরজিসির ভয়াবহ হামলার চিত্র

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বৃহস্পতিবারের ওই হামলায় জর্ডানে মার্কিন বিমান বাহিনীর সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতির চিত্র ফুটে উঠেছে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে যে জর্ডানে মার্কিন-পরিচালিত একটি বিমানঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একাধিক যুদ্ধবিমান স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং সামরিক অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্রুত বিস্তৃত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বড় ধরনের উত্তেজনা বৃদ্ধি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়, তাদের এয়ারোস্পেস ফোর্স জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ১২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, এই ঘাঁটিতে মার্কিন এফ-৩৫, এফ-১৫ এবং এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মোতায়েন রয়েছে।

ইরানি সামরিক বাহিনীর মতে, হামলার লক্ষ্য ছিল বিমান আশ্রয়কেন্দ্র (হ্যাঙ্গার), অপারেশনাল স্থাপনা এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার।

আইআরজিসি দাবি করেছে যে হামলায় ‘বিপুল সংখ্যক’ যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে, তবে তারা বিমান ক্ষয়ক্ষতির কোনো স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

ইরানের রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোও জানিয়েছে যে উন্নত যুদ্ধবিমান রাখার জন্য ব্যবহৃত একাধিক হ্যাঙ্গারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

তবে এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়নি।

অন্যদিকে, জর্ডানের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আল-আজরাক এলাকার ওপর দিয়ে আসা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের দিকে ছোড়া প্রায় ২০টি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে এবং ধ্বংসাবশেষ পড়ে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের অবকাঠামোগত ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।

এই পরস্পরবিরোধী দাবির কারণে বিমানঘাঁটিটির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক এই হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর কাছাকাছি ও দক্ষিণ ইরানের কিছু লক্ষ্যবস্তুতে সামরিক অভিযান চালায়।

ওয়াশিংটনের দাবি, মার্কিন সামরিক সম্পদ ও আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

ইরান বারবার সতর্ক করে এসেছে যে তাদের ভূখণ্ডে যেকোনো হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানা হবে।

আল-আজরাক বিমানঘাঁটির অবস্থান আঞ্চলিক সামরিক কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইরাক, সিরিয়া এবং জোটবাহিনীর ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ আকাশপথের নিকটে অবস্থিত।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এফ -৩৫ লাইটনিং টু, এফ ১৫ স্ট্রাইক ইগল এবং এফ ১৬ ফাইটিং ফেলকনের মতো যুদ্ধবিমানগুলো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান শক্তির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের মধ্যে অন্যতম।

শুধুেএফ -৩৫ বিমানের একক মূল্যই সংস্করণভেদে আট কোটি মার্কিন ডলারের বেশি হতে পারে। এছাড়া অগ্রবর্তী বিমানঘাঁটিগুলোর উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে দীর্ঘমেয়াদে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।

ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, জর্ডানে এই হামলা ছিল উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে বৃহত্তর এক অভিযানের অংশ। এর আগে আইআরজিসি দাবি করেছিল যে তারা কুয়েত ও বাহরাইনের ঘাঁটি এবং মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়েছে।

ইরানের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতের এই পর্যায়ে তারা ২০টিরও বেশি মার্কিন-সংশ্লিষ্ট সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা স্বীকার করলেও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের বেশ কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মার্কিন মূল্যায়ন অনুযায়ী, অধিকাংশ আগত ক্ষেপণাস্ত্র বহুস্তরবিশিষ্ট আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত করা হয়েছে।

সংঘাতের বিস্তার নিয়ে আঞ্চলিক সরকারগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ কৌশলগত জ্বালানি অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা এবং পরিবহন নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা জোরদার করেছে।

হরমুজ প্রণালী ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কারণে জ্বালানি বাজারেও প্রভাব পড়েছে। বিশ্বব্যাপী সরবরাহকৃত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

দীর্ঘস্থায়ী সামরিক উত্তেজনা জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং পরিবহন ব্যয় বাড়াতে পারে—এমন আশঙ্কায় অপরিশোধিত তেলের দাম অস্থির রয়েছে।

আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের নেতৃত্বে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও উভয় পক্ষের সামরিক হামলা ও পাল্টা সতর্কবার্তার কারণে অগ্রগতি সীমিত রয়েছে।

সংঘাতকে আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেওয়া থেকে ঠেকাতে জাতিসংঘ এবং বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জোরদার হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যদি স্বাধীন প্রমাণের মাধ্যমে আল-আজরাকে উল্লেখযোগ্য বিমান বা অবকাঠামোগত ক্ষতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়, তবে এই হামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘোরানো ঘটনা হয়ে উঠতে পারে।

সেক্ষেত্রে এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনার ওপর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হামলাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে।

এখন সবার নজর স্যাটেলাইট চিত্র, আনুষ্ঠানিক ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ সামরিক প্রতিক্রিয়ার দিকে—যা নির্ধারণ করবে সংঘাত সীমিত পর্যায়ে থাকবে নাকি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে রূপ নেবে, যার প্রভাব বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইসলামাবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights