ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের নেপথ্যে যা জানা গেল
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাজ্যের রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) একটি হক টি-২ প্রশিক্ষণবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার আগে জ্বালানি প্রবেশপথের একটি ক্যাপ ছাড়াই উড়ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
গত মাসে ওয়েলসের উত্তরাঞ্চলে একটি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং বিস্ফোরিত হয়। এ ঘটনায় দুই পাইলট প্যারাস্যুটের সাহায্যে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। এতে তারা সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অ্যাঙ্গেলসির আরএএফ ভ্যালি বিমানঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের কিছুক্ষণ পরই বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে। মেরামতের পর এটি প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন ছিল বলে জানা গেছে।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানের জ্বালানি প্রবেশপথের একটি ক্যাপ অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি দুর্ঘটনার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ক্যাপটি না থাকার কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্যাপটির দায়িত্ব ছিল বিমানঘাঁটির গ্রাউন্ড ক্রু বা ভূমিতে বিমান রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মীদের।
একটি সূত্র জানায়, জ্বালানি প্রবেশপথের ভাল্ভ দিয়ে জ্বালানি বাইরে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো সম্ভব হলেও ক্যাপ ছাড়া বিমান উড্ডয়ন রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে। এর সঙ্গে আরও বড় ধরনের ত্রুটি জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আরেকটি সূত্রের ভাষ্য, বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুসন্ধানেই ক্যাপটি অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এর সঙ্গে দুর্ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা যাচ্ছে না।
উড্ডয়নের পরই আগুন
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, উড্ডয়নের পর রানওয়েতে বিমানটির পেছনে আগুনের শিখা দেখা যায়। এরপর বিমানটি অস্বাভাবিকভাবে দুলতে থাকে। পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে উঠলে দুই পাইলট ইজেকশন ব্যবস্থার সাহায্যে বেরিয়ে আসেন। পরে বিমানটি নাকের দিক নিচু করে মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং বিশাল অগ্নিগোলকের সৃষ্টি হয়।
বিমানটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে অ্যাঙ্গেলসির রোসনেইগ্র এলাকার আফালন ক্যারাভান পার্কের পাশের একটি মাঠে। প্রায় দুই কোটি পাউন্ড মূল্যের বিমানটি বিধ্বস্ত হলেও বড় ধরনের প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হয়।
আরএএফ ভ্যালির স্টেশন কমান্ডার গ্রুপ ক্যাপ্টেন গেজ কারি বলেন, ভূমিতে থাকা মানুষ ও জনবসতিকে ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে পাইলট এমন দিকে বিমানটি পরিচালিত করেছিলেন, যেখানে খোলা মাঠ ছিল বলে তিনি ধারণা করেছিলেন।
অল্পের জন্য রক্ষা পান ক্যারাভান পার্কের মালিক
আফালন ক্যারাভান পার্কের মালিক ৮৮ বছর বয়সী কৃষক রিচার্ড ওয়েন দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন। তিনি জানান, প্রথম বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনলেও শুরুতে বিষয়টি গুরুত্ব দেননি। কারণ, বিমানঘাঁটির কাছাকাছি হওয়ায় ওই এলাকার ওপর দিয়ে প্রায়ই বিমান চলাচল করে।
তবে দ্বিতীয়বার বিকট শব্দ শোনার পর আগুন ও ধোঁয়া দেখতে পান তিনি। পরে বাইরে এসে পার্কের পাশের মাঠে বিমানের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখেন। বিমানের লেজের অংশ একটি ক্যারাভানের কাছেও পড়েছিল বলে জানান তিনি।
ওয়েন বলেন, ঘটনাস্থলে ঘন কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছিল। বিমানটি আরও বিস্ফোরিত হতে পারে—এমন আশঙ্কায় তিনি ধ্বংসাবশেষের কাছে যাওয়ার সাহস পাননি। পার্কের প্রায় ৩০টি ক্যারাভানের অধিকাংশই তখন খালি থাকায় তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেন। যানবাহনগুলোরও বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি।
সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল হক প্রশিক্ষণবিমানের বহর
ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বিএই সিস্টেমসের তৈরি হক টি-২ একটি দুই আসনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণবিমান। ২০০৯ সাল থেকে এটি ব্রিটিশ পাইলটদের প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত হচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধবিমান, বিশেষ করে টাইফুনের মতো সম্মুখসারির যুদ্ধবিমানের কার্যক্রম অনুশীলনের উপযোগী করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর হক সিরিজের পুরো বহরের উড্ডয়ন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। চলতি মাসের শুরুর দিকে আবার উড্ডয়নের অনুমতি দেওয়া হয়।
আরএএফ ভ্যালি বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাজ্যের চার নম্বর ফ্লাইং ট্রেনিং স্কুল অবস্থিত। দেশটির ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান চালকদের প্রশিক্ষণে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রিন্স উইলিয়ামও একসময় এই ঘাঁটিতে অবস্থান করে সি কিং হেলিকপ্টারে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
আরএএফের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অ্যাঙ্গেলসিতে হক টি-২ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা নিয়ে প্রতিরক্ষা দুর্ঘটনা তদন্ত শাখা তদন্ত করছে। তদন্ত চলমান থাকায় এ বিষয়ে এর বেশি মন্তব্য করা সমীচীন হবে না বলে জানান তিনি।
জ্বালানির ক্যাপ অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই দুর্ঘটনার কারণ ছিল- এমন সিদ্ধান্তে এখনও পৌঁছানো যায়নি। সূত্র: ডেইলি মেইল
