ভারতে ব্যবসায় দশে ১০ পেতে মরিয়া জাপানি কোম্পানি

অনলাইন ডেস্ক

ভারতের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যবসায়িক পরিধি আগামী ১০ বছরে বর্তমানের তুলনায় ১০ গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে জাপানের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মারুবেনি করপোরেশন। উত্তর আমেরিকার পরবর্তী বড় বাজার হিসেবে ভারতের সম্ভাবনার দিকে বিশেষ নজর দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসায়ুকি ওমোতো। সম্প্রতি নিক্কেইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ভারতই বর্তমানে বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে বাজার দুই অঙ্কের হারে বাড়ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকার পর্যাপ্ত সুযোগ রয়েছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার এই দেশটিতে ভোগ্যপণ্য ও উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন প্রবৃদ্ধির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

মাসায়ুকি ওমোতোর হিসাব অনুযায়ী, ভারতের বর্তমান মধ্যবিত্ত শ্রেণির জনসংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় কাছাকাছি। এর বাইরে থাকা বাকি ১০০ কোটি মানুষের আয়ও আগামীতে বাড়তে পারে, যা ভবিষ্যতে একটি বিশাল ভোক্তাবাজার তৈরি করবে। বর্তমানে মারুবেনির সবচেয়ে বড় মুনাফার উৎস যুক্তরাষ্ট্র হলেও দেশটিতে অর্জিত সফল ব্যাবসায়িক মডেল এখন ভারতেও প্রয়োগ করতে চায় তারা। এ জন্য দ্রুত পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা সম্পদ বিনিয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ওমোতো ঘোষণা দিয়েছেন যে, ভারত এখন মারুবেনির প্রবৃদ্ধির পরবর্তী প্রধান লক্ষ্য।

ভারতে ব্যবসা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট কৌশলের কথা জানিয়েছে জাপানি এই প্রতিষ্ঠানটি। এগুলো হলো সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উৎপাদন উদ্যোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়া, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা ব্যয়ের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো এবং ভারতকে কেন্দ্র করে অন্যান্য উদীয়মান বাজারে নিজেদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করা। এসব সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য সামনে রেখেই গত মার্চ মাসে ‘মারুবেনি কনজ্যুমার প্ল্যাটফর্ম ইন্ডিয়া’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। খাদ্য ও পানীয়, রেস্তোরাঁ এবং ভোগ্যপণ্য খাতের ব্যবসায় বিনিয়োগ ও সেগুলোর প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এই নতুন প্রতিষ্ঠানটি সহায়তা করবে। এমনকি স্থানীয় বাজার সম্পর্কে গভীর অভিজ্ঞতা ও সুদৃঢ় যোগাযোগ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে এর শীর্ষ পদগুলোতে ভারতীয়দেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শুধু ভোগ্যপণ্য বা খুচরা বাজারেই নয়, আবাসন খাতেও নিজেদের ব্যবসার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াচ্ছে মারুবেনি। ২০২০ সালে মুম্বাইয়ের আবাসন বাজারে প্রবেশের পর তারা পুনেসহ দেশের বেশ কয়েকটি শহরে কার্যক্রম সফলভাবে সম্প্রসারণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালে এসে ভারতে তাদের পঞ্চম আবাসন প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে অনুকূল সুযোগ তৈরি হলে হায়দরাবাদ, দিল্লি এবং বেঙ্গালুরুতেও নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়েও বিবেচনা করবে তারা।

পাশাপাশি শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিও মারুবেনির বিশেষ নজরে রয়েছে। বর্তমানে ভারতের মোট তামা আমদানির প্রায় ২০ শতাংশই সরবরাহ করে থাকে এই প্রতিষ্ঠানটি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা এআই এবং আধুনিক ডাটা সেন্টার নির্মাণের ব্যাপক প্রসারে দেশটিতে ভবিষ্যতে তামার চাহিদা আরও বহুগুণ বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ওমোতো। এ ছাড়া জাপানের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান সিটিজেন মেশিনারি ও ব্রাদার ইন্ডাস্ট্রিজের উন্নত যন্ত্রপাতি ভারতে বিক্রি এবং সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের গুরুদায়িত্বও পালন করছে মারুবেনি।

তবে বিশাল এই সম্ভাবনার পাশাপাশি ভারতের ব্যাবসায়িক পরিবেশে কিছু চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন মাসায়ুকি ওমোতো। তার মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সালিসি ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং উৎপাদন খাতের টেকসই বিকাশের মতো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান। সেবা খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বড় উৎস হয়ে উঠলেও, উৎপাদনশিল্পের সার্বিক প্রসারে ভারতের নীতিনির্ধারকদের নীতিগত উদ্যোগ অব্যাহত রাখা একান্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। সব মিলিয়ে ভারতের অপার সম্ভাবনা তুলে ধরে ওমোতো অত্যন্ত আশাবাদী সুরে মন্তব্য করেছেন যে, একবিংশ শতাব্দী হলো মূলত ভারতের শতাব্দী এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ভারতই এখন বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় জায়গা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights