ভূমিকম্পের কয়েক সেকেন্ড আগেই ভেনেজুয়েলাবাসীকে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছিল গুগল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলায় গত বুধবার আঘাত হানা শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্পে যখন একের পর এক ভবন ধসে পড়ছিল, তখন এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন স্থানীয় অনেক বাসিন্দা। মাটিতে কম্পন অনুভূত হওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ড আগেই তাদের স্মার্টফোনে ভেসে উঠেছিল গুগলের সতর্কবার্তা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) স্ক্রিনশট শেয়ার করে অনেক ব্যবহারকারী জানান, তাদের অবস্থান থেকে প্রায় ৩৪১ কিলোমিটার দূরে আঘাত হানা ভূমিকম্পটির বিষয়ে গুগল তাদের আগেভাগেই নোটিফিকেশন পাঠিয়ে সতর্ক করেছিল। কোনো ভূকম্পন তৈরি হওয়ার আগেই গুগল কীভাবে তা টের পেয়ে যায়, তার উত্তর লুকিয়ে রয়েছে আমাদের হাতের স্মার্টফোনেই।

মূলত বিশ্বজুড়ে থাকা কোটি কোটি অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনকে ব্যবহার করে গুগল গড়ে তুলেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প শনাক্তকরণ নেটওয়ার্ক বা সিসমোগ্রাফ। প্রতিটি আধুনিক স্মার্টফোনেই ‘অ্যাক্সেলেরোমিটার’ নামের একটি সেন্সর থাকে, যা সাধারণত ফোনের স্ক্রিন স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘোরানোর (রোটেট) কাজ করে। তবে এর আরেকটি বড় কাজ হলো, এটি সূক্ষ্ম কম্পনও পরিমাপ করতে পারে। কোনো এলাকায় যখন প্রাথমিক কম্পন শুরু হয়, তখন ওই এলাকার অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলো সেই কম্পন শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুগলের কেন্দ্রীয় সার্ভারে একটি সংকেত এবং সম্ভাব্য অবস্থান পাঠিয়ে দেয়। সার্ভার তখন দ্রুততম সময়ে ওই অঞ্চলের অন্যান্য ফোনের ডেটা বিশ্লেষণ করে এবং যদি একসঙ্গে অনেক ফোন থেকে একই ধরনের কম্পনের সংকেত আসে, তখন গুগল নিশ্চিত হয় যে একটি ভূমিকম্প ধেয়ে আসছে। বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটিরও বেশি অ্যান্ড্রয়েড ফোন গুগলের এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

ভূমিকম্পের তরঙ্গের চেয়ে ফোনের নেটওয়ার্ক সিগন্যালের গতি বেশি হওয়ার কারণেই মূলত এই আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হয়। ভূমিকম্পের সময় মূলত দুই ধরনের তরঙ্গ তৈরি হয়; প্রথমটি হলো ‘পি-ওয়েভ’ বা প্রাইমারি ওয়েভ, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬ কিলোমিটার গতিতে ছড়ায় তবে এটি বেশ দুর্বল। এর ঠিক পেছনেই প্রতি সেকেন্ডে ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার গতিতে ধেয়ে আসে অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ‘এস-ওয়েভ’ বা সেকেন্ডারি ওয়েভ, যা মূলত সব ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। স্মার্টফোনের সেন্সর যখন দুর্বল পি-ওয়েভটি শনাক্ত করে সার্ভারে সংকেত পাঠায়, তখন সেই তথ্য আলোর গতিতে অর্থাৎ প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৭৯২ কিলোমিটার বেগে গুগলের কাছে পৌঁছায়। ফলে ধ্বংসাত্মক এস-ওয়েভটি মানুষের ঘরবাড়ি পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই আলোর গতিতে ছুটে যাওয়া ইন্টারনেট সিগন্যালের কল্যাণে গুগল তথ্য যাচাই করে ব্যবহারকারীদের ফোনে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিতে সক্ষম হয়।

ভূমিকম্পের তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে অ্যান্ড্রয়েড সিস্টেমে দুই ধরনের অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা পাঠানো হয়ে থাকে। মৃদু কম্পনের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের প্রস্তুত করতে দেওয়া হয় ‘বি অ্যাওয়ার অ্যালার্ট’ এবং মাঝারি থেকে তীব্র কম্পনের ক্ষেত্রে জীবন ও সম্পদ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পাঠানো হয় ‘টেক অ্যাকশন অ্যালার্ট’। এই নোটিফিকেশনে ট্যাপ করলে তাৎক্ষণিক সুরক্ষার উপায়সহ ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ও তীব্রতার একটি বিস্তারিত মানচিত্রও দেখতে পান ব্যবহারকারীরা। ২০১৩ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চালু হওয়া গুগলের এই বিশেষ প্রযুক্তিটি অ্যান্ড্রয়েড ৫ বা তার চেয়ে উন্নত সংস্করণের ফোনে কাজ করে। তবে এই আগাম সতর্কবার্তা পাওয়ার জন্য ফোনে সার্বক্ষণিক ওয়াই-ফাই বা সেলুলার ডাটা সংযোগ চালু থাকতে হয়, আর কোনো ব্যবহারকারী চাইলে ফোনের সেটিংস অপশনে গিয়ে এই সুবিধাটি বন্ধও করে রাখতে পারেন।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights