ভেজাল লুব্রিকেন্টে বাড়ছে ইঞ্জিন ক্ষতির ঝুঁকি
নিজস্ব প্রতিবেদক
⇒ অনুমোদনহীন প্ল্যান্টে নিম্নমানের তেল উৎপাদনের অভিযোগ; জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা, রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রাতেও চাপ
⇒ বিএসটিআই, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত নজরদারি, অননুমোদিত প্ল্যান্ট শনাক্তকরণ এবং নিয়মিত ল্যাব টেস্টের জোর দাবি
দেশের সড়ক পরিবহন থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও কৃষিযন্ত্র-সব ক্ষেত্রেই ইঞ্জিন সচল রাখতে লুব্রিকেন্ট বা ইঞ্জিন অয়েলের ব্যবহার অপরিহার্য। কিন্তু বাজারে নিম্নমানের ও ভেজাল লুব্রিকেন্টের বিস্তার নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিদের দাবি, অনুমোদনহীন কিছু প্ল্যান্টে মানসম্মত কাঁচামাল ও নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মান অনুসরণ না করে লুব্রিকেন্ট উৎপাদন ও বাজারজাত করা হচ্ছে। এসব পণ্য ব্যবহারে ইঞ্জিনের ক্ষয় দ্রুততর হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি খরচ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
লুব্রিকেন্টের মূল কাজ হলো ইঞ্জিনের চলমান ধাতব অংশগুলোর মধ্যে ঘর্ষণ কমানো, অতিরিক্ত তাপ নিয়ন্ত্রণ এবং যন্ত্রাংশকে ক্ষয় থেকে সুরক্ষা দেওয়া। ফলে তেলের মান ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা ও স্থায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, গাড়ি বা যন্ত্রের প্রস্তুতকারকের নির্ধারিত মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা হলে ঘর্ষণ, অতিরিক্ত তাপ ও যন্ত্রাংশের ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অননুমোদিত উৎপাদনকারী ব্যবহৃত ইঞ্জিন অয়েল, নিম্নমানের বেস অয়েল কিংবা উপযুক্ত নয় এমন অ্যাডিটিভ ব্যবহার করে নতুন পণ্য হিসেবে বাজারজাত করছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্ল্যান্ট বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার পরিদর্শন ও পরীক্ষাগার প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট ব্যবহারের প্রভাব ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও অন্যান্য বাণিজ্যিক যানবাহনের পাশাপাশি ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র, ধান কাটার মেশিনসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্রে এর ব্যবহার হয়ে থাকে। শিল্পকারখানায় জেনারেটর, কমপ্রেসর ও উৎপাদনযন্ত্রের ইঞ্জিনেও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্রে অনুপযুক্ত তেল ব্যবহারে যন্ত্রাংশের ক্ষয়, অতিরিক্ত গরম হওয়া কিংবা অপ্রত্যাশিত বিকল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উৎপাদনমুখী শিল্পে যন্ত্র বিকল হলে বাড়তি মেরামত ব্যয়ের পাশাপাশি উৎপাদন বন্ধ থাকার আর্থিক ক্ষতিও হতে পারে।
পরিবহন খাতে এর আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব জ্বালানি খরচ। ইঞ্জিনের ঘর্ষণ ও কর্মদক্ষতা স্বাভাবিক না থাকলে একই কাজের জন্য বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে। এর ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। তবে ভেজাল লুব্রিকেন্ট ব্যবহারে জ্বালানি খরচ ঠিক কত শতাংশ বাড়ে-এ বিষয়ে পণ্যের মান, ইঞ্জিনের ধরন ও ব্যবহারের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষালব্ধ তথ্য প্রয়োজন।
অন্যদিকে, নিম্নমানের লুব্রিকেন্ট ব্যবহারে ইঞ্জিন বা যন্ত্রাংশ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন যন্ত্রাংশ আমদানির প্রয়োজন বাড়তে পারে। এতে ব্যবসা ও ভোক্তার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত আমদানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরি হতে পারে। একইভাবে অনুমোদনহীন উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ যথাযথভাবে কর-ভ্যাটের আওতায় না থাকলে সরকারের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ অবশ্য সরকারি তথ্য ও নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাজারে মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত নজরদারি জোরদারের দাবি উঠেছে। অনুমোদনহীন প্ল্যান্ট শনাক্ত করা, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের অনুমোদন যাচাই, বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে মান পরীক্ষা এবং আইন লঙ্ঘন হলে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। উৎপাদন থেকে পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও ওয়ার্কশপ পর্যন্ত সরবরাহব্যবস্থার নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে মেকানিক ও ব্যবহারকারীদের লুব্রিকেন্টের গ্রেড সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
ভোক্তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো গাড়ি বা যন্ত্রের প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী লুব্রিকেন্টের মান ও ঘনত্বের (এপিআই/এসএই) নির্বাচন করা। পাশাপাশি অনুমোদিত বিক্রেতার কাছ থেকে পণ্য কেনা, প্যাকেজিংয়ের সিল, লেবেল, ব্যাচ নম্বর, উৎপাদন ও মেয়াদসংক্রান্ত তথ্য এবং সম্ভব হলে কিউআর বা যাচাইকরণ ব্যবস্থা পরীক্ষা করা উচিত। অস্বাভাবিক কম দামের পণ্য কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
লুব্রিকেন্টের বাজারে মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা শুধু একটি পণ্যের সমস্যা নয়; এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয়, শিল্পের উৎপাদনশীলতা, কৃষিযন্ত্রের কার্যক্ষমতা, ভোক্তার ব্যয় এবং সম্ভাব্য রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার চাপ-সবই যুক্ত। তাই অভিযোগের ভিত্তিতে নয়, পরীক্ষাগারভিত্তিক তথ্য ও নিয়মিত বাজার নজরদারির মাধ্যমে মানহীন পণ্য শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
