মমতার দল ছাড়ায় ভাগ্য খুলল ইউসুফ পাঠানের, পাচ্ছেন জমি ‘উপহার’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতের জাতীয় দলের সাবেক মারকাটারি অলরাউন্ডার থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইউসুফ পাঠানের জীবনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাওয়া যেন সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। এনডিএ জোটে যোগদানের মাত্র কয়েক মাস কাটতে না কাটতেই এবার গুজরাট সরকারের কাছ থেকে একপ্রকার ‘উপহার’ হিসেবে পেতে চলেছেন সেই বহুকাঙ্ক্ষিত জমিটি, যা নিয়ে বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা চলছিল। বরোদায় নিজের পৈতৃক বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত এই প্রায় এক হাজার বর্গমিটার জমিটি পাওয়ার জন্য ২০১২ সাল থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন এই সাবেক ক্রিকেটার।

খবর অনুযায়ী, গত জুন মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরপরই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় ইউসুফ পাঠানের। সে সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে তৃণমূলের ২০ জন সংসদ সদস্যের সঙ্গে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ছোট রাজনৈতিক দল এনসিপিআই-এর মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ শিবিরে ভিড়ে যান তিনি।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন ইউসুফ পাঠান। রাজনৈতিক দলবদলের এই নাটকীয় অধ্যায়ের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার তার বরোদার পারিবারিক বাসভবনের পার্শ্ববর্তী বিতর্কিত জমি-সংক্রান্ত জট কেটে যাওয়ার খবর সামনে এলো।

গুজরাট রাজ্যের তাণ্ডলজা এলাকায় পাঠান পরিবারের বাসভবনটির ঠিক পাশেই অবস্থিত প্রায় এক হাজার বর্গমিটার আয়তনের ওই বিতর্কিত জমিটি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে নিজের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে ২০১২ সালে প্রথমবার এই জমির মালিকানা চেয়ে আবেদন করেছিলেন ইউসুফ। এই বাড়িতেই বাবা-মা এবং পরিবারকে নিয়ে থাকেন দুই ভাই—ইউসুফ ও ইরফান পাঠান। তবে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের পর অবশেষে রাজ্য প্রশাসন এই জমির বিরোধ মেটাতে একটি বিশেষ রূপরেখা তৈরি করেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই সমঝোতার অধীনে জমিটির অর্ধেক অংশ ইউসুফ পাঠানকে সরকার থেকে ‘উপহার’ বা বিশেষ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে এবং বাকি অর্ধেক অংশের জন্য তাকে নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করতে হবে।

নতুন এই কার্যনির্বাহী ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কল্যাণমূলক নীতির আওতায় ওই জমির মূল্যের অর্ধেক অংশ মওকুফ করা হচ্ছে, যিনি কি না গুজরাট থেকে প্রতিনিধিত্ব করে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন। ৫০ শতাংশের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ কোটি রুপি প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে পরিশোধ করবেন ইউসুফ। স্থানীয় পৌর করপোরেশন ও রাজস্ব বিভাগ এখন এই জমি হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যস্ত।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাধারণত সরকারি সম্পত্তি বা খোলা বাজার বা সাধারণ নিলামের মাধ্যমে বিক্রির নিয়ম থাকলেও, খেলাধুলা প্রচার-সংক্রান্ত বিশেষ নিয়মের বিশেষ ছাড়কে কাজে লাগিয়েই এই সরাসরি বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

২০১২ সালে যখন ইউসুফ প্রথমবার সুরক্ষার কারণ দেখিয়ে ৯৯ বছরের লিজের জন্য আবেদন করেছিলেন, তখন স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে নিলেও উচ্চ স্তরের রাজ্য কর্তারা তা খারিজ করে দিয়েছিলেন। তাদের যুক্তি ছিল, যেকোনো সরকারি সম্পত্তি হস্তান্তর করতে হলে স্বচ্ছ সরকারি টেন্ডার বা উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমেই করা উচিত। এরপর কেটে গেছে বহু বছর। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে এই জমির দখল নিয়ে টানাপোড়েনও চরমে পৌঁছায়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূলের টিকিটে ইউসুফ জয়ী হওয়ার ঠিক পরেই বিজেপি শাসিত বরোদা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন তার বিরুদ্ধে ওই জমিতে ‘জবরদখল’-এর অভিযোগ এনে নোটিশ জারি করেছিল। ওই নোটিশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন ইউসুফ।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইনি লড়াই যখন আরও বেশি জটিল আকার ধারণ করে, তখন হাইকোর্ট এই দখলদারত্বের বিষয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে। আদালত যথাযথ আর্থিক ছাড়পত্র বা চূড়ান্ত বরাদ্দ ছাড়া পৌর বা সরকারি জমি ব্যবহারের আইনি বৈধতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলে। আদালতের এই কঠোর অবস্থান ও সম্ভাব্য শাস্তির মুখে পড়ে ক্রিকেটারের আইনজীবীরা শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে চলমান আবেদনগুলো নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করে নেন, যার ফলে নতুন করে প্রশাসনিক আলোচনার পথ প্রশস্ত হয়।

একসময়ের তুমুল রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক ঘেরা এই অধ্যায়টি অবশেষে শেষের পথে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে ভারতীয় ক্রিকেটে ইউসুফের ঐতিহাসিক অবদানকে সম্মান জানাতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে ক্ষমতার দ্রুত পরিবর্তন কীভাবে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত প্রশাসনিক বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করতে পারে, এটি তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ।

সূত্র: এনডিটিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights