মাঠে বসুন্ধরা কিংস আবারও জ্বলে উঠবে
ইকরামউজ্জমান
ফুটবলার, কোচ ও অন্যদের প্রাপ্য বকেয়া মিটিয়ে ফিফার নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়েছে ঢাকা আবাহনী লিমিটেড, বসুন্ধরা কিংস ও ইয়াংমেনস ফকিরেরপুল ক্লাব। লাইসেন্সিংয়ের ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকল না।
দেশের ঘরোয়া ফুটবলের জন্য এটি অনেক বড় স্বস্তি। দেশের ফুটবলে শুধু অন্যতম শক্তিশালী দল নয়, বসুন্ধরা কিংস ও ঢাকা আবাহনী লিমিটেড গত ফুটবল মৌসুমে যথাক্রমে চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ দল, এদের ছাড়া নতুন মৌসুমে (২০২৬-২৭) ফুটবল মাঠে গড়াবে, এটি কখনো চিন্তার মধ্যে আনা হয়নি। ২০০৭ সাল থেকে দেশে পেশাদার ফুটবল লীগ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে আবাহনী ও বসুন্ধরা কিংস ছয়বার করে শিরোপা ঘরে তুলেছে।
বিষয়টি শুধু অনন্য নয়, এর থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, এই দুটি ক্লাবের ফুটবলে অবদান, ভূমিকা ও প্রভাব কত বেশি।
ফিফার নিষেধাজ্ঞা ওঠার আগে পরিবেশ-পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বসুন্ধরা কিংস ও আবাহনী ক্লাব ঘিরে সৃষ্টি হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের গল্প। সেই গল্পগুলো আর এখন মুখে মুখে নেই! এটিই বাস্তবতা। এদিকে মোহামেডান ছিল প্রথম থেকেই ফুরফুরে।

বিভিন্ন কারণে সময় তাদের সঙ্গে! আর তাই শক্তিশালী দল গঠন নিয়ে ভাবতে হয়নি। অনেক আগেই দল গুছিয়ে ফেলেছে। বিদেশি কোচও নিশ্চিত করেছে। আসন্ন ফুটবল মৌসুমে আবাহনীতে খেলতে দেখা যাবে বিদেশি কোটায় আনা বিশ্বকাপে খেলা নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড মাইকেল বাবাতুন্দে। এটি ক্লাবের বড় ধরনের চমক।
১৩টি ক্লাব নিয়ে এ বছর আসন্ন বাংলাদেশ (২০২৬-২৭) ফুটবল লীগ। কাগুজে শক্তি নিয়ে শুরু হয়ে গেছে আলোচনা ও কথাবার্তা। বিষয়টি ফুটবলের কড়াইকে গরম রাখবে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চেনা রোমাঞ্চকর লীগ ফুটবল কিন্তু বড় কঠিন। ধারাবাহিকতা ধরে রাখার পাশাপাশি খেলোয়াড়দের ফিটনেস এবং তাঁদের মধ্যে লড়াইয়ের মানসিকতা বাড়িয়ে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কাগুজে শক্তিতে অনেকে মনে করছে আসন্ন লীগ অনেক বেশি জমজমাট হবে। অথচ সাতটি দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবে।
মাঠে বসুন্ধরা কিংস আবারও জ্বলে উঠবেবসুন্ধরা কিংস বড় ফুটবল মাঠে এসেছে ২০১৮-১৯ মৌসুমে। এর পর থেকে গত কয়েক বছরে ক্লাবের ‘ট্র্যাক’ রেকর্ড শুধু অনন্য নয়, অসাধারণও বটে। দেশের ফুটবলে বসুন্ধরা কিংস ‘পাওয়ারহাউস’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। পরিচিত হয়েছে একটি আদর্শ অনুসরণীয় ক্লাব হিসেবে। পাল্টে দিয়েছে ক্লাব ফুটবল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার সংস্কৃতি। পেশাদারি মোড়কে মোড়ানো একটি ফুটবল ক্লাবের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি জনসমক্ষে যে কত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেটির উদাহরণ হলো কিংস। কিংস এরই মধ্যে একটি নিজস্ব ভাবমূর্তি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
বসুন্ধরা কিংস ২০১৮-১৯ মৌসুমে আসার পর থেকে কয়েক বছর ধরে ফুটবলে এগিয়ে আছে। খেলতে নেমে একনাগাড়ে পাঁচটি মৌসুমে শিরোপা জয় করেছে আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল ডিসি, শেখ রাসেল কেসির মতো শক্তিশালী দলগুলোকে পেছনে ঠেলে দিয়ে। একনাগাড়ে পাঁচ মৌসুমে লীগ ট্রফি জয়ের নজির ঢাকার ঘরোয়া ফুটবলে ৭৮ বছরের ইতিহাসে আর নেই। অল্প সময়ের মধ্যে বিসিএল, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (যেটি বাংলায় এখন বাংলাদেশ লীগ), ফেডারেশন কাপ, স্বাধীনতা কাপ, চ্যালেঞ্জ কাপসহ এখন পর্যন্ত শিরোপা জিতেছে ১৭টি। এ ছাড়া ক্লাবের নারী ফুটবল দল লীগ শিরোপা জিতেছে তিনটি। দুটি ধরলে মোট শিরোপা জয় ২০টি। ২৪ কম্পিটিশনের মধ্যে ২০টি শিরোপা জয়। গত তিন মৌসুমে ৯টি ট্রফির মধ্যে আটটি ঘরে তুলেছে কিংস। পেশাদার ফুটবলে অংশ নেওয়ার পর গত মৌসুমসহ ট্রেবল জিতেছে দুইবার, যে রেকর্ড এখন পর্যন্ত কোনো ক্লাবের নেই। কিংস কয়েক বছর ধরে ঢাকার ফুটবলকে আপন করে নিয়েছে।
কয়েক মাস ধরে বসুন্ধরা কিংস কঠিন সময় পার করেছে, এটি বাস্তবতা। তবে ক্লাব পরিচালনা পরিষদ ভেঙে পড়েনি। বিশ্বাস ও আস্থা হারায়নি। সব সময় বলা হয়েছে, সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক কারণে। সমস্যার সমাধান অবশ্যই হবে। সময় লাগছে। ১৪টি নিষেধাজ্ঞা থেকে ক্লাব বেরিয়ে এসে গত মৌসুমের চেয়ে অনেক বেশি দলগত শক্তি বৃদ্ধি করে দল গঠন করে ২০২৬-২৭ মৌসুমে সব শিরোপা ঘরে ধরে রাখার জন্য লড়াই করবে। এটির বাইরে আর কোনো চিন্তা নেই।
ক্লাব ব্যবস্থাপনা পরিষদের মনের জোর, সাহস ও দৃঢ়তার ভরসা হলো পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলার দয়া এবং মনে-প্রাণে খাঁটি ক্রীড়াপ্রেমিক গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের মাথার ওপরে ছায়ার মতো অবস্থান। তিনি প্রতিদিন খোঁজ রেখেছেন কাজের অগ্রগতির। কথা বলেছেন ক্লাবের সভাপতি মো. ইমরুল হাসানের সঙ্গে। সব সময় বলেছেন, ‘সবাইকে জানিয়ে দিয়ো চিন্তার কোনো কারণ নেই। বসুন্ধরা কিংস একটি উজ্জ্বল ব্র্যান্ড। আগামীতে এই ব্র্যান্ডের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে। বসুন্ধরা কিংস আরো উজ্জ্বল হয়ে মাঠে জ্বলে উঠবে।’
দেশের খেলাধুলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এসেছেন। তাঁরা দেশের বিভিন্ন খেলার মানোন্নয়নে সৃষ্টিশীল ও কার্যকর ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন বসুন্ধরা এলাকায় আধুনিক বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি নির্মাণে। এই স্পোর্টস সিটিতে সব প্রচলিত খেলার আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা আছে। নির্মাণ করা হয়েছে অত্যাধুনিক ক্রীড়াকাঠামো। সেটির প্রত্যক্ষ ফল এরই মধ্যে দেশের ক্রীড়াঙ্গন পেতে শুরু করেছে। বর্তমানে বসুন্ধরা ক্রীড়া কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিভিন্ন খেলার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এবং প্রতিযোগিতা। এগুলোর আয়োজন ভবিষ্যতে আরো বাড়বে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই স্পোর্টস কমপ্লেক্সের বিষয়টি শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নয়, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোরও জানা হয়ে গেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় তো ব্যক্তিগত পর্যায়ে খেলার ফ্যাসিলিটি বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর কেউ এত বড় উদ্যোগ নেয়নি—যেটি নিয়েছে বাংলাদেশের বসুন্ধরা গ্রুপ। আর এই সবকিছুর পেছনে আছে দেশের খেলাধুলার প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং সামাজিক কার্যক্রমের আওতায় দেশ ও দেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি।
দেশের ফুটবলের রং পাল্টে দিয়েছে বসুন্ধরা কিংস মাঠের ফুটবলের মাধ্যমে। ফুটবলের পরিবেশে এনেছে পরিবর্তন। ক্লাবটি ফুটবল মাঠে সময়ের প্রতিনিধিত্ব করছে। মোহামেডান, আবাহনীর মতো ঐতিহ্যবাহী দলের প্রচুর সমর্থক ও ভক্ত আছে দেশজুড়ে। আর এটিই স্বাভাবিক। বসুন্ধরা কিংস যেটি করতে পেরেছে, সেটি হলো তারুণ্য ও তরুণসমাজকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে। তরুণসমাজ বসুন্ধরা কিংসের খেলার মধ্যে নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছে। তারা মনে করছে, এই ক্লাবটি আধুনিক ফুটবলের চিন্তা-ভাবনার মধ্যে আছে। তারা চাইছে দেশের ফুটবলে পরিবর্তন। তরুণসমাজের মধ্যে বিভিন্ন কারণে ক্লাবটির গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়া অবশ্যই ইতিবাচক বিষয়।
বিভিন্ন সময়ে বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি মো. ইমরুল হাসানের সঙ্গে আমার সামনাসামনি ও টেলিফোনে কথা হয়েছে। দায়িত্বশীলতার দৃষ্টি থেকে তিনি অবশ্যই চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন ছিলেন—তবে কখনো তাঁর কণ্ঠে হতাশার সুর বাজতে শুনিনি। সব সময় বলেছেন, দেখবেন সময়ের আগে সব একসময় ঠিক হয়ে যাবে। কিংস তার সুনাম রেখে মাঠে আবার নামবে। প্রতিশ্রুতি পালন থেকে সরে যাবে না। গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান দেশের ক্রীড়াঙ্গনের স্বার্থে কোনো কিছুতে কখনো ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করেননি। সব সময় বলেছেন, ‘সঠিকভাবে এগিয়ে যাও—গ্রুপ সব সময় খেলার চর্চায় পৃষ্ঠপোষকতা করবে। কেননা দেশ গঠনে খেলাধুলা একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।’
গত মৌসুমে ফুটবলে ট্রেবল জয়ের পর ২২ মে ২০২৬ কিংসের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের জন্য একটি জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। প্রধান অতিথি তাঁর মূল্যবান বক্তব্যে বলেছেন, ‘আমি শুনেছি যে খেলোয়াড়রা এবার অনেক অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে, যেটার হয়তো প্রতিদান আমি দিতে পারব না। কিন্তু ইনশাআল্লাহ ইমরুল সাহেব (বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান) যার সঙ্গে যা চুক্তি করেছেন, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এক টাকাও কাউকে কম দেবেন না। হয়তো দুই দিন দেরি হতে পারে। কিন্তু কোনো খেলোয়াড় হতাশ হবে না, এটা নিশ্চিত বলতে পারি।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমি আশা করি, ইনশাআল্লাহ আগামী দিনে বসুন্ধরা কিংস আরো অনেক অনেক বেশি জ্বলবে। অনেক বেশি প্রমাণ করে দেবে যে কিংস সব সময় কিংস এবং তোমাদের যে ত্যাগ, এই খেলোয়াড়দের যে ত্যাগ-তিতিক্ষা, এটা আজীবন আমার মনে থাকবে, আমার সন্তানদেরও মনে থাকবে। বসুন্ধরা গ্রুপের সবার মনে থাকবে এবং তার প্রতিদান নিশ্চয়ই বসুন্ধরা গ্রুপ দেবে।’
তিনি আরো বলেছেন, ‘দেশের ফুটবলের উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বসুন্ধরা গ্রুপ। এর সঙ্গে কিংসও দেশের ফুটবলে অনেক অবদান রাখছে। বসুন্ধরা কিংস অবশ্যই বাংলাদেশের ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখছে। যদি বসুন্ধরা কিংস প্রবেশ না করত, আজ হয়তো বাংলাদেশের ফুটবল থাকতই না। এর বিশেষ দাবিদার বসুন্ধরা কিংসের খেলোয়াড় এবং বিশেষ করে আমাদের ইমরুল। সে ফুটবলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ বলা যায়। আমি আশা করি, বাংলাদেশ ফুটবলে এই বসুন্ধরা কিংসে যারাই খেলে, তাদের অবদান এই দেশ, এই জাতি, এই বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ কোনো দিন অস্বীকার করতে পারবে না।’ (কালের কণ্ঠ, ২৩ মে ২০২৬)
দেশি, সাফ এবং বিদেশি কোটায় পরীক্ষিত খেলোয়াড় নিয়ে ৩৫ সদস্যের কিংস স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে। জাতীয় দলের কেউ কেউ ক্লাব ছেড়ে অন্য ক্লাবে চলে গেছেন আস্থার অভাব, অনিশ্চয়তার কথা ভেবে। পেশাদার ফুটবলে সবার সুযোগ আছে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আবার একবার ক্লাব ছেড়ে গেছেন, সেই ক্লাবে ফিরে আসা যাবে যদি তাঁর গ্রহণযোগ্যতা থাকে। প্রথম থেকেই বলা হচ্ছে, বসুন্ধরার লক্ষ্য আসন্ন মৌসুমের দুই বা তিনটি (যদি শেষ পর্যন্ত এক দিনের চ্যালেঞ্জ কাপের খেলা অনুষ্ঠিত হয়) ট্রফি জয়। ক্লাবের দায়িত্বে থাকবে গত মৌসুমের পরীক্ষিত স্থানীয় কোচিং প্যানেল। এবারের স্কোয়াড নিয়ে তারা আশাবাদী। রবসন রোবিনহোর ফিরে আসা অনেক বড় বুস্টআপ দলের জন্য। তবে সবকিছু নির্ভর করছে মাঠের দলগত সমঝোতার ওপর। স্পোর্টস রিপোর্টার প্রায় প্রতিদিন ফুটবলের আপডেট জানিয়েছেন। অনুশীলন শুরু হয়েছে। আর তাই অন্য কথা বলা হবে কিছুদিন পর। রোমাঞ্চকর ফুটবল লীগ সব সময় টানে।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া
