মার্কিন প্রযুক্তি দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়ছে ইরান?

অনলাইন ডেস্ক
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখন ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে মোড় নিয়েছে। গতকাল শনিবার মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান তার সামরিক শক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে।

ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে বিধ্বংসী আক্রমণ চালাতে যাচ্ছে। ইতিমধেই কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। একইসঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করেছে তারা।

বিশ্বজুড়ে কৌশলগত বিশেষজ্ঞদের মনে এখন প্রশ্ন, ইরান এই যুদ্ধ কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিতে পারলেই দুই-তিন দিনের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু নির্দেশ করছে। ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন, ইরান দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রও দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণ চালিয়ে যাবে।

ইরানের এই টিকে থাকার লড়াইয়ের মূলে রয়েছে তাদের আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন প্রযুক্তি। যা তারা বছরের পর বছর ধরে রাশিয়ার সহায়তায় গড়ে তুলেছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ভাণ্ডার রয়েছে। শাহাব-৩ এবং সেজজিলের মতো ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক ফাত্তাহ-১ এর মতো হাইপারসনিক মিসাইল। এগুলো ২,০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা প্রতিটি মার্কিন ঘাঁটি এবং ইউরোপের একাংশ এখন ইরানের নাগালের মধ্যে। শুধু ক্ষেপণাস্ত্র নয় ইরান এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান ড্রোন শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তাদের শাহেদ-১৩৬ এবং মোহাজের-৬ ড্রোনের ঝাঁক যে কোনো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করে গুঁড়িয়ে দিতে পারে।

ইরানের এই সামরিক সক্ষমতার পেছনে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের সাম্প্রতিক ২০ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্বের চুক্তি বড় ভূমিকা রাখছে। যদিও রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর আইনি বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে চলছে। তবুও তারা তেহরানকে অত্যাধুনিক এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইয়াক-১৩০ যুদ্ধবিমান দিয়ে সহায়তা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি কয়েকশ মিলিয়ন ইউরোর একটি গোপন চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়া ইরানকে তাদের আধুনিক ‘ভারবা’ ম্যানপ্যাড সিস্টেম সরবরাহ করেছে। এই প্রযুক্তিটি নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন, হেলিকপ্টার এবং ক্রুজ মিসাইল শনাক্ত ও ধ্বংস করতে ইরানের আকাশসীমাকে অভেদ্য করে তুলেছে।

সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ইরান এখন পশ্চিমাদের তৈরি অস্ত্র দিয়েই পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দান থেকে রাশিয়া যেসব পশ্চিমা অস্ত্র যেমন জ্যাভলিন অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মিসাইল বা স্টিঙ্গার এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম জব্দ করেছে, সেগুলো তারা সরাসরি তেহরানে পাঠিয়েছে।

ইরানের প্রকৌশলীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই পশ্চিমা প্রযুক্তিগুলোর রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং হুবহু নকল তৈরি করে নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন। অতীতেও তারা মার্কিন সেন্টিনেল ড্রোনের আদলে নিজেদের ড্রোন তৈরি করে বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছিল।

ইরানের এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পেছনে চীনের ভূমিকাও কম নয়। অনেক সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান সরাসরি যন্ত্রাংশ না পেলেও চীন তাদের বিভিন্ন পশ্চিমা ডিজাইনের ইঞ্জিনের নকশা ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে সাহায্য করছে। এর ফলে ইরানের ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে এমন সব আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে যা আসলে জার্মান বা মার্কিন নকশা থেকে কপি করা। বেইজিং ও তেহরানের এই সামরিক লেনদেন ইরানের প্রতিরক্ষা শিল্পকে অপরাজেয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সমুদ্রপথেও ইরান তাদের সাগর অবরোধ কৌশল কার্যকর করতে মরিয়া। তারা হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। ইরানের নৌবাহিনী তাদের দ্রুতগামী অ্যাটাক বোট, মিজেট সাবমেরিন এবং চীনা ডিজাইনের শক্তিশালী অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল ব্যবহার করে মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য ত্রাস সৃষ্টি করেছে। এমনকি তারা সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজকে ড্রোনবাহী রণতরীতে রূপান্তর করে সমুদ্রের মাঝখান থেকেই আকাশপথে আক্রমণ চালানোর সক্ষমতা অর্জন করেছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি যদি তাদের শেষ লড়াইও লড়ে, তবে তারা কোনোভাবেই বিনা যুদ্ধে হার মানবে না। তাদের এই লড়াইয়ের বিশেষত্ব হলো, তারা খোদ আমেরিকার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেই আমেরিকার আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান যেভাবে রাশিয়ার হাত ধরে পশ্চিমা অস্ত্রের নকল তৈরি করে নিজেদের সুরক্ষিত করেছে, তা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই রণক্ষেত্রে এখন দেখার বিষয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্রুত জয়ের স্বপ্ন সত্যি হয় নাকি ইরান দীর্ঘস্থায়ী গেরিলা যুদ্ধের পথে হাঁটে।

সূত্র: ইউরোশিয়ান টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights